Home কুষ্টিয়া কুষ্টিয়ায় অবৈধভাবে বালি লুটে জাসদ আওয়ামীলীগ একজোট

কুষ্টিয়ায় অবৈধভাবে বালি লুটে জাসদ আওয়ামীলীগ একজোট

123

কুষ্টিয়ায় অবৈধভাবে বালি লুটে জাসদ আওয়ামীলীগ একজোট

কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার রাজনীতির ময়দানে মহাজোটের প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও জাসদের নানা বিষয়ে মতবিরোধ এবং সংঘাত রয়েছে। তবে পদ্মা নদী ও তীরবর্তী এলাকা থেকে অবৈধভাবে মাটি এবং বালু উত্তোলনে দু’দলের নেতাদের গলায় গলায় ভাব। উভয় দলের নেতারা মিলেমিশে উপজেলার তিন ইউনিয়নের সাতটি স্থান থেকে প্রতিদিন শত শত ট্রাক বালু ও মাটি উত্তোলন করে বিক্রি করছেন। এমনকি ব্যক্তি মালিকানাধীন কৃষিজমি থেকেও জোর করে মাটি বিক্রির অভিযোগ উঠেছে।

গত ২ ফেব্রুয়ারি ভেড়ামারার বাহিরচর, মোকারিমপুর ও বাহাদুরপুর ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, দেদার তোলা হচ্ছে নদী ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার মাটি ও বালু। পদ্মাবেষ্টিত বাহিরচর ইউনিয়নের ১২ মাইল এলাকায় চারটি, মোকারিমপুর ইউনিয়নের বাগগাড়ি মাঠসহ দুটি এবং বাহাদুরপুর ইউনিয়নের রায়টা গ্রামে একটি স্থান থেকে বালু ও মাটি তুলে বিক্রি হচ্ছে।

এলাকাবাসী জানান, সাত স্থান থেকে প্রতিদিন ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ ট্রাক মাটি ও বালু উত্তোলন করা হয়। এর দাম ৭ থেকে ১০ লাখ টাকা। বাহিরচরে উত্তোলনে জড়িত ইউনিয়ন জাসদের সাধারণ সম্পাদক আবু হোসেন, উপজেলা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সোহানুর রহমান সোহাগ ও শফি মেম্বারদের সিন্ডিকেট। মোকারিমপুর ইউনিয়নে মাটি উত্তোলনে জড়িত ফকিরাবাদের যুবলীগ নেতা কুতুব উদ্দিন। বাগগাড়ি এলাকায় একই কাজ চলছে ইউনিয়ন যুবজোটের সাধারণ সম্পাদক শামীমুল ইসলাম তুষার ও যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ইয়াসির আরাফাতের নেতৃত্বে। বাহাদুরপুর ইউনিয়নের রায়টা ঘাট এলাকায় ফসলি জমি থেকে মাটি কেটে বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে ইউপি চেয়ারম্যান সোহেল রানা পবনের বিরুদ্ধে।

এ ছাড়া এসব কাজে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শামীমুল ইসলাম ছানা উপজেলা চেয়ারম্যান আক্তারুজ্জামান মিঠু এবং বর্তমান মেয়র ও উপজেলা যুবজোটের সহসভাপতি আনোয়ারুল কবির টুটুলেরও নাম উঠে এসেছে। বাগগাড়ি মাঠ এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, তীর থেকে নদীর প্রায় দেড় কিলোমিটার ভেতরে গিয়ে ট্রাকে বালু তুলে আনা হচ্ছে। সেখানে যাওয়ার পর মোটরসাইকেল নিয়ে হাজির হন কয়েকজন। এর মধ্যে যুবজোট নেতা তুষারও ছিলেন। তিনি নিজেকে পৌর মেয়র টুটুলের লোক বলে পরিচয় দেন।

বাহাদুরপুর ইউনিয়নের রায়টা নতুনপাড়া পাথরঘাটের পাশেই কৃষিজমিতে দুটি ভেকু মেশিন কাটা হচ্ছে। স্থানীয় দুই কৃষক বলেন, আমাদের জার্ম থেকে মাটি কেটে বিক্রি করে দিচ্ছেন চেয়ারম্যান পবন ও তাঁর লোকজন।

ইউপি চেয়ারম্যান পবনকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, রায়টা নতুনপাড়া পাথরঘাটের পাশের জায়গাটি নাটোর জেলার মধ্যে। একজন প্রতিমন্ত্রীর ভাই জায়গাটি ইজারা নিয়ে আমাদের মাটি কাটতে বলেছেন। আওয়ামী লীগ নেতা শামীমুল ছানা দাবি করেন, বাগগাড়ি সংলগ্ন নদী থেকে বালু কাটার ইজারা আছে। আর চেয়ারম্যান পবনের শত্রু বেশি। তাঁর বিরুদ্ধে কথা বলবে, এটা স্বাভাবিক। আমাদের নামও বলতে পারে নেতাকর্মীরা। অন্যায় কিছু করছি না।

উপজেলা চেয়ারম্যান আক্তারুজ্জামান মিঠু বলেন, ‘আমি অনেক কিছু জানি, তবে বলতে পারি না। আমি এসব কাজের সঙ্গে থাকি না।

পৌর মেয়র ও জাসদ নেতা টুটুল বলেন, “আমি প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক করে এসব বন্ধের নির্দেশ দিয়েছি। কোনো চোর-বাটপার আমার নাম ভাঙিয়ে এসব করতে পারে। এটার সঙ্গে আমার ও দলের কোনো নেতার সম্পর্ক নেই।’

মাটি, বালু দেদার খননের ফলে নদীর তলদেশে গভীর খতের সৃষ্টি হয়। সে কারণে বর্ষায় পলিমাটি এসে গর্তে পড়লে আশপাশের পাড়ে ভাঙনের সৃষ্টি হয়। এতে নদীর গতিপথ বেঁকে যায়। সে কারণে এই অঞ্চলে প্রতি বছর ব্যাপক ভাঙন দেখা দেয়। নদীর পানিপ্রবাহের একাধিক ধারা তৈরি হয় বলে জানান বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন কুষ্টিয়া শাখার কর্মী মোহা. জাহিদুজ্জামান।

বালুমহালের বিষয়টি পুরোপুরি জেলা প্রশাসন দেখে—জানিয়ে কুষ্টিয়া পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ আতাউর রহমান জানান অনিয়ন্ত্রিতভাবে যদি বালু বা মাটি কাটা হয়, তবে সেটি অবশ্যই পরিবেশের জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর ও হুমকিস্বরূপ।

প্রতিদিন তাঁরা একটি যন্ত্র দিয়ে ৫০ থেকে ৬০টি ট্রাকে বালু ভরতে পারেন। চারটি এক্সকাভেটর দিয়ে প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩০০ ট্রাক বালু ও মাটি উঠছে।

বালু পরিবহনে নিয়োজিত এক ট্রাকচালক জানান, বড় ট্রাক থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা, মাঝারি এক হাজার টাকা ও ছোট যানবাহন থেকে ৬০০ টাকা করে নিচ্ছে। টাকা নিলেও কোন রশিদ দেওয়া হয় না বলে জানান পাবনার চাটমোহরের বাসিন্দা এক্সকাভেটর (মাটিকাটার যন্ত্র) চালক মোহাম্মদ হৃদয়।

বালু উঠছে, ইজারা নেওয়া হয়েছে। কারা ইজারা দিয়েছেন জানতে চাইলে সরল জবাব—‘দলীয়ভাবে মহাজোট চালাচ্ছে।’ তাঁদের নাম কী—এমন প্রশ্নের উত্তরে লিমন সর্দার বলেন, জাসদের নেতা আবদুল আলিম ওরফে স্বপন, মেয়র আনোয়ারুল ইসলাম, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শামীমুল ইসলাম, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আক্তারুজ্জামান বাগগাড়িতে টাকা তোলেন মধ্য গোলাপনগর এলাকার বাসিন্দা লিমন সর্দারৎ জানিয়েছেন।

ইউএনও হাসিনা মমতাজ বলেন, আমি সরেজমিন গিয়েছিলাম বিষয়টি দেখতে। এসব বিষয়ে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমার অফিসের কেউ জড়িত থাকলেও ব্যবস্থা নেব। জেলা প্রশাসক সাইদুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনিও বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন বলে জানান।