Home কুষ্টিয়া কুষ্টিয়ায় সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতন কি ‘স্বাভাবিক’ হয়ে উঠল 

কুষ্টিয়ায় সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতন কি ‘স্বাভাবিক’ হয়ে উঠল 

157

কুষ্টিয়ায় সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতন কি ‘স্বাভাবিক’ হয়ে উঠল

গত ২৯শে মে, ২০০৬ কুষ্টিয়ায় আয়োজন করা হয় সাংবাদিক নির্যাতন বিরোধী সমাবেশে জেলা বিএনপি অফিসের ভেতর থেকে বের হয়ে তারা ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করতে করতে সমাবেশ স্থলে এসে মারপিট-ভাঙচুর শুরু করে কপাল ফেটে রক্ত ঝরলো ইকবাল সোবহান চৌধুরীর। আহত হলেন ২৩ জন সাংবাদিক। অনেকের মোবাইল, ক্যামেরা ও মোটর সাইকেল ভেঙ্গে ফেলা হলো। কিছুক্ষণ দাড়িয়ে দেখলো পুলিশ। পরে ঢাকা থেকে নির্দেশ পেয়ে পুলিশের আরেকটি দল গিয়ে আক্রান্তদের উদ্ধার করে।

বিএনপি সরকার বিদায় নেবার পর এক এগারো সরকারের আমলে আবার হামলার ঘটনায় মামলা করার উদ্যোগ নেয়া হয়। দৈনিক খবরের প্রতিনিধি ওই হামলায় আহত সাংবাদিক শামীম বিন সাত্তার বাদী হয়ে কুষ্টিয়া থানায় মামলাটি দায়ের করেন ২০০৭ সালের ২৫শে মার্চ। সাবেক সাংসদ শহীদুল ইসলাম, মেহেদী আহমেদ রুমীসহ আসামী করা হয় ১২ জনকে।

গত গত ৫ ডিসেম্বর ২০২০ রাত ৯ টার দিকে দুর্বৃত্তরা শহরের প্রবেশমুখ মজমপুর গেট চত্বরে অবস্থিত কুষ্টিয়া-ঢাকা এসবি পরিবহনের টিকিট কাউন্টারে হামলা ও ব্যাপক ভাংচুর করে। এরপর সন্ধ্যায় শহরের লোকালয়ে অবস্থিত জেলা বিএনপির অফিসে ভাংচুর চালায়। এসব ঘটনার ফুৃটেজ ধারণ করার সময় দীপ্ত টিভির কুষ্টিয়া প্রতিনিধি দেবেশ চন্দ্র সরকার ও ক্যামেরা পারসন হারুনকে নির্দয়ভাবে পিটিয়ে আহত করা

২৮ এপ্রিল ২০২১কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে এটিএন বাংলার ক্যামেরা পার্সন পুলিশের নির্যাতনের শিকার

গত ৫ আগস্ট ২০২২ শালদহে পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় কুষ্টিয়ার সনামধন্য কুষ্টিয়ার খবর পত্রিকার ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ও মানবাধিকার কর্মী আবু মনি সাকলায়েন এবং সাপ্তাহিক পথিকৃৎ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, দৈনিক সত্যখবর পত্রিকার সহ-সম্পাদক ও বাংলাদেশ মানবাধিকার সমিতি কুষ্টিয়া জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক শাহারিয়া ইমন রুবেলের সশস্ত্র হামলা চালায়। এসময় তাদের ব্যবহৃত ক্যামেরা এবং টাকা ছিনিয়ে নেয়। স্থানীয়দের সহায়তায় সেদিন সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীদ্বয় কোনমতে প্রাণে বেঁচে গেলেও মারাত্মকভাবে আহত হয় ও কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণ করেন।

গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২২ সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হয়েছেন কুষ্টিয়ার তিন সাংবাদিক। তারা হলেন এস এ টিভির জেলা প্রতিনিধি, দৈনিক কুষ্টিয়ার কাগজের সম্পাদক ও প্রকাশক নূর আলম দুলাল, ডেইলি সানের জেলা প্রতিনিধি রেজাউল করিম রেজা এবং এস এ টিভির ক্যামেরা পারসন হাবিব।

কুষ্টিয়ার স্থানীয় সাংবাদিক হাসিবুর রহমান রুবেলকে নিজ কর্মস্থল থেকে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়। গত ৩ জুলাই মোবাইল ফোনে কল পেয়ে অফিস থেকে বেরিয়ে এনএস রোডের সিঙ্গার মোড়ের দিকে যান তিনি। এর পর থেকে তাঁর ব্যবহৃত তিনটি মোবাইল ফোন নম্বরই বন্ধ পাওয়া যায়। চার দিন পর ৭ জুলাই কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলায় গড়াই নদীর ওপর নির্মাণাধীন কুমারখালী যদুবয়রা সংযোগ সেতুর নিচ থেকে রুবেলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

গত বছর কুষ্টিয়ায় মাদক ব্যবসায়ীর ক্ষুর ও ছুরিকাঘাতে সময়ের কাগজের স্টাফ রিপোর্টার গুরুতর আহত।

আজ ১৯ জুন ২০২৪ বিকেল ৫ টার দিকে আবারও কুষ্টিয়ার হরিপুর বাজারে কুষ্টিয়ায় এশিয়ান টেলিভিশনের স্টাফ রিপোর্টার ও স্থানীয় দৈনিক সত্য খবর পত্রিকার প্রকাশক ও সম্পাদক এবং কুষ্টিয়া টিভি জার্নালিস্ট এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক হাসিবুর রহমান রিজুর উপর সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটেছে তিনি বর্তমান কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় রেফার্ড করে ।

সংবাদ প্রকাশের জের ধরে স্থানীয় শিপন, আসলাম, মুরাদ, ফারুক, সাজ্জাদসহ আরও ১০ থেকে ১৫ জন এই হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছেন আহত হাসিবুর রহমান রিজু।

বিপুল ক্ষমতাশালী মানুষদের ক্রোধ ও আক্রমণের মুখে সবচেয়ে অসহায় মফস্বল সাংবাদিকেরা। মামলা হলে তা সামলানো কিংবা হামলা হলে বিচার চাওয়ার হুজ্জত মোকাবিলা করা সাধারণ সাংবাদিকদের পক্ষে অসম্ভব, যদি তাঁদের প্রতিষ্ঠান পাশে না দাঁড়ায়। বিভক্ত সাংবাদিক সমিতিগুলোও উদাসীনতাই শ্রেষ্ঠ পন্থা মনে করে।

রক্তের দাগ শুকিয়ে যাবে, কবরে ঘাস গজাবে, মানুষও সাংবাদিকতা পেশার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিহত মানুষদের ভুলে যাবে। যদি সংবাদপত্রের কাগজগুলো সাদাই থাকত, টেলিভিশনের পর্দা দিনরাত ঝিরঝির করত আর অনলাইন পোর্টালগুলোতে লেখা থাকত ‘৪০৪ সিস্টেম এরর’—তাহলে হয়তো সাংবাদিকতার জরুরত মালুম হতো অনেকের। সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনকে তখন এতটা ‘স্বাভাবিক’ মনে হতো না। কিন্তু প্রতিকূল পরিবেশে সে উপায়ও নেই গণমাধ্যমের। একদল সাংবাদিক তবু পেশাগত পবিত্রতা মাথায় নিয়ে পবিত্র প্রাণীর মতো অপঘাতের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে যান। পরাজয় জেনেও যিনি লড়াই করে যান, তাঁকেই বলে সংশপ্তক। বাংলাদেশের সাংবাদিকতা এখন সংশপ্তক পর্ব পার করছে।