Home বাংলাদেশ পদ্মার ১১ পয়েন্টে এখনো চলছে অবৈধ বালু উত্তোলনের মহোৎসব

পদ্মার ১১ পয়েন্টে এখনো চলছে অবৈধ বালু উত্তোলনের মহোৎসব

12

পদ্মার ১১ পয়েন্টে এখনো চলছে অবৈধ বালু উত্তোলনের মহোৎসব

বারবার অভিযান চালিয়েও পদ্মা নদী থেকে বন্ধ করা যায়নি অবৈধ বালু উত্তোলন। হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা দেয়া এলাকার ১১টি পয়েন্ট থেকে এখনো প্রকাশ্যেই অবৈধভাবে বালু তোলা হচ্ছে। প্রায় প্রতিদিনই শতাধিক বড় বড় নৌকা করে বালু নিয়ে যাওয়া হচ্ছে প্রকাশ্যেই। অপরিকল্পিতভাবে বালু তোলায় নদীর স্বাভাবিক প্রকৃতি যেমন নষ্ট হচ্ছে তেমনি তীব্র ভাঙন দেখা দিচ্ছে পাড়ে।

চলতি বছরের শুরুর দিকে নদীর গতিপ্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, হার্ডিঞ্জ ব্রিজসহ নদীপাড়ের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তার স্বার্থে রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ থেকে ঈশ্বরদী হার্ডিঞ্জ ব্রীজ এলাকা পর্যন্ত বালু তোলায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন হাইকোর্ট। তারপরও অনেকটা প্রকাশ্যে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট প্রতিদিন কোটি টাকার বালু তুলছে এসব এলাকা থেকে। এজন্য ১১টি পয়েন্টে নদীতে বসানো হয়েছে অসংখ্য ছোট বড় ড্রেজার ও চোষক মেশিন।

এই চক্রটি কখনো উচ্চ আদালতের অনুমতির কাগজ দেখিয়ে, কখনো আবার নৌপুলিশকে ম্যানেজ করে বালু উত্তোলন করে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার বারোমাইল টিকটিকিপাড়ার এক বাসিন্দা জানান, বালু উত্তোলনের কারণে তাঁরা হুমকির মুখে। পদ্মার তীরে তাঁর ৪০ বিঘা জমি ছিল। ভাঙতে ভাঙতে এখন ২০ বিঘা অবশিষ্ট রয়েছে। তাও যেকোনো মুহূর্তে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে।

উত্তাল পদ্মা নদীতে সহজে প্রশাসন অভিযান চালাতে পারে না- এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তারা বালু তুলেই যাচ্ছে। যেদিন প্রশাসন অভিযান চালায় সেদিন নৌকা ভিড়িয়ে রেখে পাবনা প্রান্তে উঠে ফসলের ক্ষেত ও কলা বাগানে লুকিয়ে পড়ে। আভিযানিক দল চলে গেলে আবার লেগে পড়ে বালু উত্তোলন ও পরিবহনে। এ কারণে কুষ্টিয়া প্রশাসন বারবার অভিযান চালিয়েও বালু উত্তোলনকারীদের ধরতে পারছে না।

সরেজমিন দেখা গেছে নদীতে ডেজার ও চোষক মেশিন দিয়ে তোলা হচ্ছে বালু। বালুভর্তি নৌকার কর্মী রেজাউল বলেন, বালু তোলা অন্যায় কি-না জানিনা। নৌকার মালিক রূপপুরের মনসুর যেমনটি বলেন আমাদের তেমনি করতে হয়। একই নৌকার মিন্টু মিয়া বলেন, মহাজনের কাজ করে খাই, যেমন বলেন তেমটি করি। মসলেমপুরের খাইরুল যুক্তি দেখান ‘বালু তুললে নদী খনন হয়ে যাবে।

আজই আসছি বালু তুলতে। অবৈধ হলে আর আসবো না। ’এদিকে পাকশী সেতু ও রেলব্রীজের কাছাকাছি এমনকি রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাছাকাছি এলাকা থেকেও মাঝে মধ্যে তোলা হচ্ছে বালু। এতে হুমকির মুখে পড়েছে ওইসব স্থাপনা। একপ্রান্তে কুষ্টিয়ার মিরপুর ও ভেড়ামারা উপজেলায় শত শত বিঘা কৃষি জমি চলে গেছে নদী গর্ভে। অন্য প্রান্তে পাবনার মধ্যেও কলা গাছ ও বিভিন্ন ফসলসহ জমি ভেঙ্গে যাচ্ছে নদীতে।

এসব ব্যাপারে কথা হয় কুষ্টিয়ার তালবাড়িয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল হান্নান মন্ডলের নতুন টাইমসকে জানান,আমি যুগিয়া-তালবাড়িয়া ধুলট মহল ইজারা নিয়েছি। আমার কোন নৌকা কুষ্টিয়া জেলার মধ্য থেকে বালু তোলে না। আমি পাবনা থেকে বালু নিয়ে আসি। আমার ঘাটে এসে বালু নামানো হলে আমি টাকা পাই। কিন্তু বালু তোলায় নিষেধাজ্ঞা থাকায় ঘাট নিয়ে আমার লোকসান হচ্ছে।

এদিকে হাইকোর্টের নির্দেশে বালু তোলা বন্ধে কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসন এপ্রিল মাসে উপজেলায় উপজেলায় মনিটরিং টিম গঠন করেছেন। ওইসব কমিটিতে সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে আহ্বায়ক, পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলী, সহকারী কমিশনার (ভূমি), থানার ওসি ও নৌ পুলিশের পরিদর্শককে সদস্য করা হয়। এসব কমিটি নিয়ম করে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু প্রভাবশালী কোন বালু উত্তোলনকারীকে আটক বা জরিমানা করা যায়নি। বন্ধ করা যায়নি বালু উত্তোলন।

বালু তোলা নিয়ে তাদের কোন দায় নেই। এ বিষয়ে তাদের কোন কর্মকাণ্ড নেই বলেও জানান। তিনি বলেন, বালু উত্তোলন বন্ধে গঠিত জেলা টাস্কফোসের সদস্য হিসেবে এ বিষয়ক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়ে থাকি মাত্র।

এদিকে, বালু উত্তোলন বন্ধে অভিযান জোরদার করা হয়েছে। সোমবার সকাল ১১টা থেকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কুষ্টিয়া সদর সহকারি কমিশনার (ভূমি) দবির উদ্দিন অভিযান চালিয়ে কাউকে ধরতে পারেননি। তবে, পদ্মা নদীতে এসময় বিপুল পরিমাণ অবৈধ বালুবাহী নৌকা দেখতে পান বলে জানান তিনি। কিন্তু নৌকার গতি তুলনামূলক কম থাকায় অবৈধ বালু উত্তোলন ও পরিবহনকারীদের কাউকে ধরা যায়নি। দবির উদ্দিন বলেন, নৌকা রেখে সাঁতরে উঠে তারা কলাবাগান দিয়ে পালিয়ে গেছে।বলে জানান কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদুর রহমান।

কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক মো. এহেতেশাম রেজা বলেন, উচ্চ আদালতের স্পস্ট নির্দেশ আছে গোয়ালন্দ থেকে পাকশী পর্যন্ত কোন বালুমহাল ইজারা দেয়া যাবে না। আমরা এই এলাকায় সব ইজারা বন্ধ রেখেছি। তিনি বলেন, এসব এলাকায় বালু তোলা অবৈধ। আদালত থেকে বালু তোলা বন্ধ করার নির্দেশনাও দিয়েছেন। আমরা সেই মর্মে কাজ করছি। কিন্তু ভোগলিক সীমারেখার কারণে উত্তোলনকারীরা বারবার পাবনা জেলার মধ্যে পালিয়ে যায়। এবার দুই জেলা প্রশাসন মিলে যৌথ অভিযান চালানোর পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। মঙ্গলবার সকালে তিনি বলেন, পদ্মা নদীতে আজও প্রশাসনের অভিযান চলছে।