দৌলতপুরে তিন দিনে তিন মরদেহ উদ্ধার, দুই হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার ২
কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে তিন দিনে তিনটি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে পৃথক দুটি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অনলাইন জুয়ায় টাকা হারিয়ে বন্ধুকে হত্যা, সীমান্তে মাদক চোরাচালানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষ এবং দুই ভাইয়ের বিরোধের জেরে বড় ভাইয়ের মৃত্যুর ঘটনায় উপজেলাজুড়ে উদ্বেগ ছড়িয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স, রাতে গণপরিবহন ও অন্যান্য যানবাহনে ডাকাতি এবং ছিনতাইয়ের ঘটনাও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সীমান্তবর্তী এ উপজেলায় মাদক চোরাচালান, অনলাইন জুয়া, আধিপত্য বিস্তার ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিস্তার ঘটছে। একের পর এক হত্যাকাণ্ড, মরদেহ উদ্ধার ও ডাকাতির ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।
গত বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সকালে উপজেলার পিয়ারপুর ইউনিয়নের কামালপুর সাতবিল মাঠ থেকে রাজা হোসেন (২৫) নামের এক যুবকের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) বিকেলে রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের দুর্গম চরাঞ্চলের চড়ুইকুড়ি (মরার চর) গ্রামে মাদক চোরাচালানের নিয়ন্ত্রণ ও ভাগাভাগি নিয়ে সংঘর্ষে নিহত হন গোলাম মস্তফা টেঙ্গর (৬০)। শুক্রবার (২ অক্টোবর) সকালে হোগলবাড়িয়া ইউনিয়নের সোনাইকুণ্ডি গ্রামের তাজপুর এলাকায় ছোট ভাইয়ের হাতে বড় ভাই রাসেল হোসেন (২৭) নিহত হয়েছেন বলে অভিযোগ ওঠে। তবে এ ঘটনাকে দুর্ঘটনা বলে দাবি করেছে পরিবার।
*অনলাইন জুয়ায় টাকা হারিয়ে বন্ধুকে হত্যা*
পুলিশের দাবি, অনলাইন জুয়ায় বড় অঙ্কের টাকা হারিয়ে আর্থিক সংকটে পড়েছিলেন রিফাছ হোসেন (২৬)। সেই সংকট কাটাতে বন্ধু রাজা হোসেনের কাছ থেকে টাকা আদায়ের পরিকল্পনা করেন তিনি। পরিকল্পনা অনুযায়ী, রাজাকে ডেকে নিয়ে মাদক সেবনের পর জাল বা নেটজাতীয় বস্তু দিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। পরে রাজার মোবাইল ফোন ব্যবহার করে তাঁর পরিবারের কাছে টাকা দাবি করা হয়।
গত বুধবার সকাল সোয়া ৬টার দিকে কামালপুর সাতবিল মাঠের ইট বিছানো সড়কের পাশে খড় ও ঘাসের নিচে এক যুবকের মরদেহ দেখতে পান স্থানীয় কৃষক সানাউল্লাহ। এ সময় কয়েকটি শিয়ালকে মরদেহের পাশে টানাটানি করতে দেখেন তিনি। পরে পুলিশকে খবর দিলে মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পাশে পড়ে থাকা স্যান্ডেল, হাতঘড়ি ও পোশাক দেখে পরিবারের সদস্যরা মরদেহটি নিখোঁজ রাজা হোসেনের বলে শনাক্ত করেন। তিনি ওই গ্রামের ইমাম আলীর ছেলে। সোমবার রাত থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন। এ ঘটনায় তাঁর পরিবার থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিল।
মরদেহ উদ্ধারের সময় ঘটনাস্থল থেকে সন্দেহভাজন চার যুবককে পুলিশ হেফাজতে নেয়। জিজ্ঞাসাবাদে রিফাছ হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন বলে দাবি পুলিশের। পরে তাঁকে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। অপর তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
এ ঘটনায় নিহতের বাবা ইমাম আলী বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে দৌলতপুর থানায় হত্যা মামলা করেছেন।
*সীমান্তে মাদক চোরাচালানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষে নিহত*
বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের ভারত সীমান্তসংলগ্ন চড়ুইকুড়ি (মরার চর) গ্রামে চোরাচালানের নিয়ন্ত্রণ ও ভাগাভাগি নিয়ে দুই পক্ষের সংঘর্ষে গোলাম মস্তফা টেঙ্গর নিহত হন। তিনি ওই গ্রামের মৃত দৈয়ব মণ্ডলের ছেলে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে আসা মাদকের চালান ও চোরাচালানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য আজাহার মেম্বারের পক্ষের সঙ্গে পটল মণ্ডলের গ্রুপের বিরোধ চলছিল। গত দুই-তিন দিন ধরে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা, বাগ্বিতণ্ডা ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এরই জেরে বৃহস্পতিবার বিকেলে দেশীয় অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে তারা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এ সময় কয়েক রাউন্ড গুলিবর্ষণের ঘটনাও ঘটে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
সংঘর্ষের একপর্যায়ে পটল মণ্ডলের ছোট ভাই টেঙ্গরের পেটে প্রতিপক্ষের ছোড়া সড়কি ও গুলি লাগে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় উভয় পক্ষের সুমন মিয়া (৫০), হাদু মণ্ডল (৭০), রাশিদুল (৩৫), ফটিক (৫৫), বজলু (৫৫), আজাদ মণ্ডল (৬০) ও রাজু মণ্ডল (৩০) আহত হন। তাঁদের স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজ মণ্ডল বলেন, দুই পক্ষের মধ্যে কয়েক দিন ধরে বিরোধ ও উত্তেজনা চলছিল। পরে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়।
এ ঘটনায় শুক্রবার বিকেলে নিহতের স্ত্রী মাছেমা খাতুন বাদী হয়ে ২২ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও সাত থেকে আটজনকে আসামি করে মামলা করেছেন। মামলার এজাহারভুক্ত আসামি সামাজুল ইসলাম (৫৫) গ্রেপ্তার হয়েছেন। তিনি ওই এলাকার মৃত সৈয়দ আলী বিশ্বাসের ছেলে। তাঁকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
*ছোট ভাইয়ের হাতে বড় ভাই নিহতের অভিযোগ*
শুক্রবার সকাল ১১টার দিকে উপজেলার হোগলবাড়িয়া ইউনিয়নের সোনাইকুণ্ডি গ্রামের তাজপুর এলাকায় ছোট ভাইয়ের হাসুয়ার আঘাতে বড় ভাই রাসেল হোসেন (২৭) গুরুতর আহত হন। পরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়।
নিহত রাসেল ও তাঁর ছোট ভাই ইমরান হোসেন (২০) ওই এলাকার আহাদ আলীর ছেলে। স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সকালে দুই ভাইয়ের মধ্যে বিরোধের একপর্যায়ে এ ঘটনা ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, ছোট ভাই ইমরানের হাসুয়ার আঘাতে রাসেল আহত হন।
পরে তাঁকে উদ্ধার করে স্থানীয় একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। তবে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই পথে তাঁর মৃত্যু হয়।
নিহতের মা রাশেদা খাতুন বলেন, বাঁশ কাটতে গিয়ে হাতে থাকা হাসুয়ার আঘাতে তাঁর বড় ছেলের পা গুরুতর জখম হয়। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর দাবি, বড় ছেলে নেশাগ্রস্ত ছিলেন। এ কারণে দুর্ঘটনার পর তাঁর শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয়ে থাকতে পারে। তবে ছোট ছেলে ইমরানের আঘাতে রাসেল আহত হওয়ার বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ছোট ছেলে ইমরানই পরিবারের দেখাশোনা ও উপার্জনের দায়িত্ব পালন করেন।
হোগলবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ও প্যানেল চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম বলেন, এলাকায় বড় একটি বিয়ের অনুষ্ঠান থাকায় পাড়ার অধিকাংশ মানুষ সেখানে কাজে ব্যস্ত ছিলেন। ফলে প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বাঁশ কাটতে গিয়ে হাসুয়ার আঘাতে রাসেল আহত হন। তবে স্থানীয়ভাবে দুই ভাইয়ের মধ্যে বিরোধের জেরেও এ ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে শোনা যাচ্ছে।
*ডাকাতি ও ছিনতায়*
হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি উপজেলায় রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স, গণপরিবহন ও অন্যান্য যানবাহনে ডাকাতির ঘটনা এবং বিভিন্ন সময়ের ছিনতাইয়ের অভিযোগও রয়েছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় সড়কে চলাচলকারী যাত্রী ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, সীমান্ত ও দুর্গম চরাঞ্চলে অপরাধ দমন, মাদক চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ এবং উপজেলা জুড়ে নিয়মিত টহল জোরদার করা জরুরি। একের পর এক অপরাধের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে স্থানীয়রা।
*পুলিশের বক্তব্য*
দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খালেদুর রহমান বলেন, বুধবার ও বৃহস্পতিবার পৃথক দুটি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে দুটি পৃথক মামলায় দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে ।
এদিকে শুক্রবারে উদ্ধার করা মরদেহর বিষয়ে বলেন, ছোট ভাইয়ের হাতে বড় ভাই নিহত হওয়ার খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে গিয়েছিলাম । হাসপাতালে নেওয়ার পথে রাসেলের মৃত্যু হয়েছে। পরিবারের দাবি, বাঁশ কাটার সময় হাত থেকে হাসুয়া ছুটে গিয়ে তিনি গুরুতর আহত হন। তবে ছোট ভাইয়ের হাতে বড় ভাই খুন হওয়ার তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে পুলিশ তদন্ত করছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে
কুষ্টিয়া জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফয়সাল মাহমুদ বলেন, দৌলতপুরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে পুলিশ অবগত রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে দ্রুত অভিযান চালানো হচ্ছে। এসব তৎপরতার মাধ্যমে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তিন দিনে তিনটি মরদেহ উদ্ধার, পৃথক দুটি হত্যা মামলায় দুজনের গ্রেপ্তার, সীমান্তে সশস্ত্র সংঘর্ষ এবং ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের অভিযোগ—সব মিলিয়ে দৌলতপুরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অপরাধ দমন, সীমান্তে নজরদারি এবং সড়কে নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।