হাম ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে গত তিন মাসে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (রামেক) অন্তত ৬২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পর্যাপ্ত নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) সুবিধা না থাকায় এত প্রাণহানি ঘটেছে। মৃত শিশুদের মধ্যে ৯ জন আইসিইউতে ভর্তির সুযোগ পেলেও শেষ পর্যন্ত তাদের বাঁচানো যায়নি।
চিকিৎসকেরা বলছেন, এসব রোগের জটিলতা বাড়লে দ্রুত নিবিড় পরিচর্যার প্রয়োজন হয়। কিন্তু রামেক হাসপাতালে শিশুদের জন্য আলাদা কোনো আইসিইউ নেই। সাধারণ আইসিইউর ১২টি শয্যা শিশুদের জন্য নির্ধারিত রাখা হয়েছে। ফলে পর্যাপ্ত শয্যা না থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই সময়মতো শিশুদের চিকিৎসা দেওয়া যাচ্ছে না।
সরেজমিনে হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ড ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি শয্যাতেই একাধিক রোগী ভর্তি করা হয়েছে। এমনকি মেঝেতেও চলছে চিকিৎসা; সেখানেও রয়েছে অক্সিজেনের জন্য অপেক্ষা। রোগীর স্বজনদের ভিড় ও উৎকণ্ঠা আর নার্সদের ব্যস্ততা—সব মিলিয়ে এক চাপা আতঙ্ক বিরাজ করছে ওয়ার্ডজুড়ে।
মারা যাওয়া শিশুদের মা-বাবার অভিযোগ, সময়মতো আইসিইউ সুবিধা পেলে হয়তো তাঁদের সন্তান বেঁচে থাকত।
পবা উপজেলার মুরারিপুর এলাকার মো. আলম গত দুই সপ্তাহ ধরে তাঁর সাড়ে আট মাস বয়সী অসুস্থ শিশুকে নিয়ে হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে আছেন। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুটির প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট। আদরের সন্তানের এমন কষ্টে নীরবে চোখের পানি ফেলছেন আলম।
চিকিৎসকেরা শিশুটিকে বাঁচাতে জরুরি ভিত্তিতে আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন, কিন্তু সেখানে শয্যা খালি নেই। তাই আইসিইউর সামনে চলছে তাঁর অন্তহীন অপেক্ষা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আইসিইউ পাবেন কি না, তা নিশ্চিত হতে পারছেন না তিনি। আইসিইউতে সাধারণত দীর্ঘ চিকিৎসার প্রয়োজন হয় বলে সহজে শয্যা খালি হয় না। ফলে নিজের শিশুর জীবন ছেড়ে দিতে হয়েছে ভাগ্যের ওপর।
রামেক হাসপাতালের আইসিইউর ইনচার্জ ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, ‘১২ শয্যার শিশু আইসিইউতে কেউ মারা না গেলে সাধারণত শয্যা খালি হয় না। তখন অপেক্ষমাণ তালিকায় থাকা স্বজনদের ফোন করা হয়।’
এই চিকিৎসক জানান, গত ১১ থেকে ১৮ মার্চ—সাত দিনেই আইসিইউতে ভর্তির অপেক্ষায় থাকা ২৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ভর্তির পর মারা গেছে আরও ৯ জন।
চিকিৎসকেরা বলছেন, নিউমোনিয়ার পাশাপাশি হামও মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। তাঁদের দাবি, অভিভাবকেরা শিশুদের প্রাণঘাতী এই রোগের টিকার ডোজ শেষ করছেন না। ফলে হামে শিশুমৃত্যু উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
আমাদের নিয়মিত টিকা কার্যক্রম চলছে। তবে কী কারণে হাম বাড়ল, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। সারা দেশে শিগগির টিকা ক্যাম্পেইন করা হবে। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর উদ্যোগ নেবে বলে জানান রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাবিবুর রহমান।