ফের শুরু হয়েছে অবৈধভাবে বালু তোলার প্রতিযোগিতা
হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার বিবিয়ানা পাওয়ার প্লান্ট ও শেরপুর অর্থনৈতিক জোন এলাকায় বালুমহালে অবৈধভাবে বালু তোলার প্রতিযোগিতা ফের শুরু হয়েছে। এর ফলে বসতবাড়ি ও বিবিয়ানা পাওয়ার প্লান্ট ঝুঁকির মুখে রয়েছে। এছাড়া কুশিয়ারা নদীর উভয় তীরে ৫৭১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন প্রতিরক্ষামূলক বাঁধ ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসহ গোয়াট তীর রক্ষা প্রকল্প রয়েছে ভাঙন হুমকির মুখে পড়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, নতুন সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর পরিস্থিতি পরিবর্তনের প্রত্যাশা ছিল। সেটি হয়নি। কুশিয়ারা নদীতে চলছে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের মহোৎসব। কোনো ধরনের বৈধ অনুমতি ছাড়া স্থানীয় প্রশাসনের চোখের সামনে অবাধে বালু লুট করছেন স্থানীয় কয়েকজন অসাধু ব্যবসায়ী।
জানা গেছে, কুশিয়ারা থেকে এখন একমাত্র বৈধ বালু উত্তোলক হিসেবে রয়েছে মা এন্টারপ্রাইজ। এছাড়া আর কোনো প্রতিষ্ঠানের সেখান থেকে বালু তোলার অনুমোদন নেই। তা সত্ত্বেও প্রতিদিন অবৈধভাবে ৬ থেকে ৭টি প্রতিষ্ঠান নিয়মিত বালু তুলছে এই নদী থেকে।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানান, দেশের পট পরিবর্তনের পর উপজেলার শীর্ষ এক বিএনপি নেতার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় বর্তমানে আশরাফ ও তালুকদার এন্টারপ্রাইজ দীঘলবাক মৌজার দুর্গোয় ও গালিমপুর এলাকা থেকে অবৈধভাবে নদীর বালু উত্তোলন করছে। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছেন দীঘলবাক এলাকার স্থানীয় ইউপি সদস্য রুহুল আহমেদ, ফখরুল মেম্বার, নুরুল আমিন, পারকুলের সাজু আহমেদ ও দুলু মেম্বার। তারা প্রশাসনকে ম্যানেজ করে কুশিয়ারা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন অব্যাহত রেখেছেন। ফলে হুমকির মুখে রয়েছে নদীর উভয় তীরে অবস্থিত নির্মাণাধীন প্রতিরক্ষামূলক বাঁধসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। নিজেদের নিরাপত্তা ঝুঁকি সৃষ্টি পরিস্থিতি দেখেও প্রভাবশালী চক্রের ভয়ে অবৈধখভাবে বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে নারাজ স্থানীয়রা।
চলমান পরিস্থিতিতে প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পরিবেশবাদীরা। তবে দ্রুত এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুলতানা জেরিন।সিলেট-সুনামগঞ্জ-মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের মিলনস্থল শেরপুর অর্থনৈতিক জোন এলাকা। চার জেলার সীমান্তবর্তী এলাকা শেরপুর সেতুর অদূরে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার কুশিয়ারা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে যাচ্ছে একাধিক সংঘবদ্ধ চক্র। আউশকান্দি ইউনিয়নের পাহাড়পুর, পারকুল এলাকা থেকে ওয়াহিদ এন্টারপ্রাইজ, তালুকদার এন্টারপ্রাইজ, সাজু আহমেদ, দুলু মেম্বার, বালু আশরাফসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান অনুমতি না নিয়ে পাঁচ থেকে ছয়টি ড্রেজার মেশিন বসিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বালু উত্তোলন করে আসছে।
স্থানীয় একাধিক রাজনীতিক জানান, এই চক্রে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি–উভয় দলের নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণ রয়েছে। অপরিকল্পিতভাবে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে নদীর ভাঙন আরও তীব্র আকার ধারণ করছে।
এ বিষয়ে স্থানীয় গ্রামবাসী আশরাফ উদ্দিন জানান, কুশিয়ারা নদীর উভয় তীরে ৫৭১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন প্রতিরক্ষামূলক বাঁধসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা আজ হুমকির মুখে। দুর্গোয় গ্রামের মকরম আলী বলেন, প্রকাশ্যে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হলেও প্রশাসন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় গ্রামের মানুষ হতাশ।
সরেজমিন দীঘলবাক গ্রাম এবং দুর্গোয়, পাহাড়পুর, পারকুল, গালিমপুর, মাধবপুর এলাকায় গিয়ে দেখা যায় কুশিয়ারা নদীর ওপর বড় বড় একাধিক ড্রেজার মেশিন বসিয়ে বালু তোলা হচ্ছে। এ কাজে নিয়োজিত শতাধিক শ্রমিক। দীঘলবাক ও তাজাভাদ মৌজায় বালু উত্তোলন শেষে বড় নৌকায় করে তা কৃষিজমিতে এবং নদীতীরের কয়েকটি স্থানে স্তূপ করে রাখা হচ্ছে। এছাড়া ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে পিতুয়া গ্রামের কাছে কয়েকটি স্তূপ করে সাদা বালু রাখা হয়েছে। এছাড়া বালু উত্তোলনের মেশিন নদী থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে বড় বড় পাইপ দিয়ে পারকুল বিদ্যুৎ পাওয়ার প্লান্টসংলগ্ন স্থান, মজিদপুর, কুমারকাড়া মন্দিরের কাছে এবং দীঘলবাক এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে বালু স্তূপ করে রাখা হয়েছে বিক্রির উদ্দেশ্যে।
হবিগঞ্জ জেলা বাপার সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল সোহেল জানান, নদীর তলদেশ থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন পরিবেশের জন্য প্রচণ্ড হুমকির। বর্তমানে এর প্রভাব কম মনে হলেও ভবিষ্যতে এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাই পরিবেশ রক্ষায় সংশ্লিষ্টদের দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। নদী গভীর হওয়ার কারণে ভাঙনের মুখে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে কুশিয়ারা ডাইক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।স্থানীয় বাসিন্দা মুশাহিদ আলী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে ওই এলাকা থেকে সাদা বালু উত্তোলন করা হলেও প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। বালু তোলার কারণে নদী ও নদীতীরের ফসলি জমি হুমকির মুখে পড়েছে। অনেক স্থানে বাড়িঘরেও ভাঙন দেখা দিয়েছে।
আবু মিয়া নামের আরেক ব্যক্তি জানান, চক্রটি খুবই প্রভাবশালী। তাদের বিরুদ্ধে কথা বললে তারা সাধারণ লোকজনকে নানাভাবে হয়রানি করে। তাদের সাদা বালু তোলার কোনো ধরনের অনুমতি নেই। অথচ তারা দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশ ধ্বংস করে বালু উত্তোলন করে আসছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি বলেন, বিএনপির শীর্ষ এক নেতাসহ স্থানীয়দের সঙ্গে প্রভাবশালীদের নিয়ে তালুকদার এন্টারপ্রাইজ,
বালু আশরাফ, রুহুল মেম্বার, নুরুল আমিন, ফখরুল মেম্বার ও সাজু আহমেদ গংয়ের সঙ্গে আঁতাত করে যৌথভাবে বালু উত্তোলন কাজ চলছে। কোনো প্রকার অনুমতি না থাকলেও দলীয় প্রভাব খাটিয়ে এই মহোৎসব চলছে।
কুশিয়ারা থেকে বালু উত্তোলনের ব্যাপারে জানতে চাইলে তা স্বীকার করে সাজু আহমেদ বলেন, তারা তালুকদার এন্টারপ্রাইজের কাছ থেকে বালু কিনছেন। তাদের অনুমোদন রয়েছে।
বালু উত্তোলনকারী চক্রের নেতা নুরুল আমিন জানান, তাদের ১০ থেকে ১২ জনের একটি দলগত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। সবাই মিলে ওয়াহিদ এন্টারপ্রাইজ ও তালুকদার এন্টারপ্রাইজের কাছ থেকে বালু ক্রয় করছেন। তাদের কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্ৰ রয়েছে।
ওয়াহিদ এন্টারপ্রাইজের পরিচালক ওয়াহিদুজ্জামান চৌধুরী বলেন, সরকারের নির্দিষ্ট জায়গা থেকে সরকারের নির্দিষ্ট অনুমতি নিয়ে বালু তোলার কাজ করছেন। এখানে সাংবাদিকদের এত মাথাব্যথা থাকার কথা না।
তালুকদার এন্টারপ্রাইজের মালিক আশরাফ হোসেন ওরফে বালু আশরাফ বলেন, সরকারের রয়্যালটি দিয়ে বৈধভাবে বালু উত্তোলন ও বিক্রি করছেন। এখনও তাঁর কাগজের মেয়াদ আছে, তাই বালু তুলছেন।
মা এন্টারপ্রাইজের মতিউর রহমান বলেন, তিনি বৈধ কাগজপত্ৰ দিয়ে বালু উত্তোলন করছেন। যারা অবৈধভাবে বালু তুলছেন, তাদের কোনো বৈধ অনুমোদন নেই। তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান তিনি। সূত্র সমকাল