শরীরে কিছু পরিবর্তন হয়তো আপনি প্রতিদিনই অনুভব করছেন—হালকা পেটব্যথা, হঠাৎ ওজন কমে যাওয়া কিংবা খাবারে অরুচি। বেশিরভাগ মানুষ এসবকে গ্যাস্ট্রিক, বদহজম বা বয়সের প্রভাব ভেবে এড়িয়ে যান। কিন্তু চিকিৎসকেরা বলছেন, কখনও কখনও এই সাধারণ সমস্যাগুলোই হতে পারে অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের নীরব ইঙ্গিত।
অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে সবচেয়ে জটিল ক্যানসারগুলোর একটি ধরা হয়। কারণ এই রোগ সাধারণত শুরুতেই ধরা পড়ে না। অন্য অনেক ক্যানসারের মতো এর জন্য নিয়মিত স্ক্রিনিং টেস্টও নেই। ফলে রোগটি অনেক সময় নীরবে শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যত দ্রুত এই ক্যানসার শনাক্ত করা যায়, চিকিৎসার সফলতার সম্ভাবনাও তত বাড়ে। তাই শরীরের কিছু অস্বাভাবিক পরিবর্তনকে অবহেলা না করাই ভালো।
অগ্ন্যাশয় বা প্যানক্রিয়াস পেটের ভেতরে গভীরে থাকা একটি অঙ্গ, যা হজম ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অবস্থানগত কারণে এখানে তৈরি হওয়া টিউমার সহজে ধরা পড়ে না। অনেক সময় লক্ষণ দেখা দিলেও মানুষ বুঝতে পারেন না সমস্যাটি কতটা গুরুতর। চিকিৎসকদের ভাষায়, অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের উপসর্গগুলো অনেকটাই “নন-স্পেসিফিক” অর্থাৎ এগুলো অন্য সাধারণ সমস্যার সঙ্গেও মিলে যায়।
যেসব লক্ষণে সতর্ক হবেন
১. চোখ ও ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়াহঠাৎ চোখের সাদা অংশ বা ত্বক হলুদ দেখালে সেটি জন্ডিসের লক্ষণ হতে পারে। সঙ্গে প্রস্রাব গাঢ় রঙের হয়ে যাওয়া বা পায়খানার রঙ ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়ার মতো পরিবর্তনও দেখা দিতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অগ্ন্যাশয়ের মাথার দিকে টিউমার হলে এটি পিত্তনালিতে চাপ সৃষ্টি করে। ফলে শরীরে পিত্ত জমে গিয়ে জন্ডিস দেখা দেয়। ব্যথা ছাড়া জন্ডিস হলে সেটিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত।
২. হঠাৎ ওজন কমে যাওয়া
কোনো চেষ্টা ছাড়াই দ্রুত ওজন কমে গেলে সেটি শরীরের বড় ধরনের সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। অগ্ন্যাশয় হজমে সাহায্য করে, তাই এখানে সমস্যা হলে শরীর খাবার ঠিকভাবে গ্রহণ ও প্রক্রিয়াজাত করতে পারে না। ফলে অস্বাভাবিকভাবে ওজন কমতে থাকে।
৩. পেট বা পিঠে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা
উপরের পেট বা পিঠে ব্যথা অনেকেই গ্যাসের সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যান। কিন্তু দীর্ঘদিন এমন ব্যথা থাকলে সতর্ক হওয়া জরুরি। বিশেষ করে ব্যথা যদি ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে বা নিয়মিত ফিরে আসে।
৪. হঠাৎ ডায়াবেটিস ধরা পড়া
৫০ বছরের পর হঠাৎ ডায়াবেটিস ধরা পড়লে চিকিৎসকেরা কখনও কখনও অগ্ন্যাশয়ের অবস্থাও পরীক্ষা করার পরামর্শ দেন। যদিও সব ডায়াবেটিস রোগীর অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার হয় না, তবে এটি কখনও কখনও প্রাথমিক সতর্ক সংকেত হতে পারে।
৫. হজমে অস্বাভাবিক পরিবর্তন
অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার হজমের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে। যেমন—তৈলাক্ত বা ভেসে থাকা পায়খানা খাবারে অরুচি খাওয়ার পর অতিরিক্ত ক্লান্ত লাগা পেট ফাঁপা বমি বমি ভাব বা বদহজম
একসঙ্গে এসব সমস্যা দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত।সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে যারা
বিশেষজ্ঞদের মতে, ৫০ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে এই ক্যানসারের ঝুঁকি বেশি। এছাড়া যাদের পরিবারে অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের ইতিহাস আছে, ধূমপান করেন, অতিরিক্ত ওজন বা দীর্ঘদিনের প্যানক্রিয়াটাইটিস রয়েছে তাদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। ডায়াবেটিস, অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ এবং অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়ার অভ্যাসও ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
চিকিৎসকেরা বলছেন, শুরুতেই ধরা পড়লে অস্ত্রোপচার ও আধুনিক চিকিৎসার মাধ্যমে অনেক রোগী দীর্ঘদিন ভালো থাকতে পারেন। কিন্তু দেরি হলে চিকিৎসা জটিল হয়ে যায়। তাই শরীরের ছোট ছোট পরিবর্তনকে স্বাভাবিক ভেবে অবহেলা না করাই ভালো।
সূত্র: ব্যানার হেলথ