কুষ্টিয়া ৬ উপজেলায় বঞ্চিত হয়েছেন প্রকৃত উপকারভোগীরা গরিবের চালের কার্ড বিএনপি- জামায়াত’র ভাগাভাগি
স্টাফ রিপোর্টার
পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে অসহায়-গরিব মানুষের জন্য বরাদ্দ করা ভিজিএফ কার্ড ভাগাভাগির করে নিয়ে বিতরণ করেছেন বিএনপি ও জামায়াত নেতারা। ওয়ার্ড ভিত্তিক বিএনপি নেতারা শতকারা ৪০ ভাগ ও জামায়াত
নেতারা ২০ ভাগ কার্ড নিয়েছেন বলে একাধিক চেয়ারম্যান নিশ্চিত করেছেন। জেলার প্রতিটি পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের ওয়ার্ড পর্যায়ে দলীয় নেতাদের কার্ড ভাগাভাগির এমন অভিযোগ করেছেন উপকারভোগীরাও। এতে প্রকৃত দরিদ্র পরিবারগুলো সহায়তা থেকে বঞ্চিত
হয়েছেন। তবে বিএনপি-জামায়াত নেতারা বলছেন, কার্ড ভাগাভাগির কোন ঘটনা ঘটেনি। কার্ড নিয়ে প্রকৃত গরিব মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। অভিযোগ স্বীকার করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছেন, অভিযোগ অস্বীকার কোন উপায় নেই। সারাদেশে একই অবস্থা।
জেলা ত্রান ও পূর্ণবাসন কর্মকর্তার কার্যালয় সুত্রে জানা যায়, পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে জেলার ৬ উপজেলা ও চার পৌরসভার ৯১ হাজার ৪১০ পরিবারের মাঝে ভিজিএফ কার্ড করা হয়েছে। প্রতি কার্ডের বিপরীতে ১০ কেজি করে চাল দেয়া হয়েছে। এরমধ্যে কুষ্টিয়া সদর
উপজেলা ১৫ হাজার ১২৭ পরিবারের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে এক লক্ষ ৫১ হাজার কেজি চাল এবং কুমারখালী উপজেলায় ১০ হাজার ৪১১ পরিবারের
মাঝে এক লক্ষ ৪ হাজার কেজি এবং দৌলতপুর উপজেলায় প্রায় ২০ হাজার পরিবারের মাঝে দুই লাখ কেজি চাল বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া জেলার
মিরপুর, ভেড়ামারা ও খোকসা উপজেলায় প্রায় ৪৫ হাজার ৮৭২ পরিবারের মাঝে চাল বিতরণ করা হয়।
একাধিক সুত্র নিশ্চিত করেছে, ইউনিয়ন ও পৌরসভার ওয়ার্ড পর্যায়ে ভিজিএফ কার্ড প্রস্তুতের সময় বিএনপি ও জামায়াত নেতারা অধিকাংশ কার্ড দাবি করেন। কুষ্টিয়ার চারটি সংসদীয় আসনের মধ্যে তিনটি আসনে জামায়াত ইসলামীর সংসদ সদস্য রয়েছেন। অপরদিকেবর্তমান ক্ষমতাশীন দল বিএনপি। দুই দলের নেতারাই প্রভাব খাটিয়ে অধিকাংশ কার্ড দাবি করেন। এনিয়ে মতবিরোধ তৈরী হলে বিপাকে পড়েন কর্মকর্তারা। পরে সমন্বয় করে দুই দলের নেতা ও চেয়ারম্যানদের মাধ্যমে কার্ড বিতরণ করতে বাধ্য হয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এতে অনেক সচ্ছল পরিবারের সদস্যরাও কার্ড পেয়েছেন। অথচ প্রকৃত হতদরিদ্রদের নাম তালিকায় রাখা হয়নি।
কুষ্টিয়া সদর উপজেলার ৪ং বটতৈল ইউনিয়নে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, একজন মানুষ ২ থেকে ৩টি কার্ড নিয়ে চাউল সংগ্রহ করছেন। গণমাধ্যমকর্মীর উপস্থিতি টের পেয়ে একাধিক কার্ডে চাউল
দেয়া বন্ধ করে দেয়া হয়। এসময় খাজানগরের কয়েকজন নারী একাধিক কার্ড নিয়ে চাউল নিতে গেলে ওই ওয়ার্ডের মেম্বার আলতাব হোসেন একটি কার্ডের বিপরীতে চাউল দেন।
বটতৈল ইউনিয়নের তথ্যমতে, সেখানে ভিজিএফ'র চাউলের ১১৯৪টি কার্ড বরাদ্দ পেয়েছেন। এরমধ্যে বিএনপিকে দুইশত এবং জামায়াতকে
৪০টি কার্ড দেয়া হয়েছে। এছাড়া ৩ জন মহিলা মেম্বারকে ৭০ করে ২১০টি কার্ড দেয়া হয়েছে। বঁাকি কার্ড ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও মেম্বারের মধ্যে ভাগাভাগি করা হয়েছে। এই ভাগাভাগির কারণে ইউনিয়নের বিভিন্ন ওয়ার্ডের অনেক অসহায় দুঃস্থ পরিবার ভিজিএফ’র চাউল থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বটতৈল ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আবুল কালাম বলেন, এবার আমরা খুশি হয়েই বিএনপিকে দুইশত এবং জামায়াতকে ৪০টি ভিজিএফ’র কার্ড দিয়েছি।
ভিজিএফ কার্ডের চাল বিতরণ নিয়ে বেশি অনিয়ম হয়েছে কুমারখালী উপজেলায়। এখানে বিএনপির তিনভাগে বিভক্ত। তিন গ্রুপই আলাদা আলাদা কার্ড দাবি করে চাপ সৃষ্টি করেন। অবশেষে প্রশাসনের মধ্যস্থতায় তিন গ্রুপকে শতকারা ১৬ ভাগ করে মোট ৪৮ ভাগ এবং জামায়াতকে ৩৫ ভাগ কার্ড দেয়া হয়। এখানে কার্ডের ভাগ পেয়েছেন এনসিপি, গণ অধিকার ও ইসলামী আন্দোলনের নেতারাও। কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির আহবায়ক কুতুব উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, আসলে বিষয়টি এমন না। বর্তমানে ওয়ার্ড পর্যায়ে কোন
জনপ্রতিনিধি নেই। তাই সবাইকে ডেকে সমন্বয় করে ভিজিএফ কার্ড বিতরণের দায়িত্ব দেয়া হয়। এখানে কোন ভাগাভাগির ঘটনা ঘটেনি। জেলা জামায়াতে সেক্রেটারী সুজাউদ্দিন বলেন, আমাদের ভাগের
ভিজিএফ কার্ড শতভাগ স্বচ্ছতার মাধ্যমে বিতরণ করেছি। একজনও বলতেপারবে না কার্ড নিয়ে আমরা নয়ছয় করেছি। প্রকৃত দরিদ্র, এমনকি হিন্দু পরিবারের মাঝে আমরা ভিজিএফ কার্ড দিয়েছি।
কুষ্টিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হারুন অর রশিদ বলেন, প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভার মাধ্যমে ভিজিএফ কার্ডের চাল বিতরণ করা হয়েছে। এখানে দলীয় ভাবে কার্ড বিতরণের কোন সুযোগ নেই। তবে এবারের পেক্ষাপট যেহেতু ভিন্ন, তাই সকলকে সমন্বয় করে তালিকা তৈরী করা হয়। সকলকে সমন্বয় করা হলেও প্রকৃত দরিদ্র পরিবার ছাড়া কাউকে কার্ড দেয়া হয়নি বলে জানান এই কর্মকর্তা।