কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে নিজেকে পীর হিসেবে পরিচয় দেওয়া আব্দুর রহমান ওরফে শামীমকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় মামলা দায়ের হওয়ার দুই দিন পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করেনি পুলিশ।মামলা দায়ের হওয়ার পরও একজন আসামিকে প্রকাশ্যে দেখা যাওয়ার কথা জানিয়েছেন স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা; যদিও পুলিশ বলছে, আসামিদের পাওয়া যাচ্ছে না বলে কাউকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি।
এর আগে, গত শনিবার কুষ্টিয়ার ফিলিপনগর ইউনিয়নের দারোগার মোড় এলাকায় 'শামীম বাবার দরবার শরিফ' এ হামলা চালিয়ে আব্দুর রহমানকে হত্যা করা হয়, যিনি নিজেকে ওই দরগার প্রধান পীর বলে পরিচয় দিতেন।
ঘটনার পর আব্দুর রহমানের পরিবারের পক্ষ থেকে তার বড় ভাই মো. ফজলুর রহমান নতুন টাইমসকে জানিয়েছিলেন, তারা কোনো মামলা করতে চাচ্ছেন না। তবে ঘটনার তিন দিন পর মঙ্গলবার ফজলুর রহমান নিজে বাদী হয়ে চারজন আসামির নাম উল্লেখ করাসহ ১৮০ থেকে ২০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন।
আসামিদের মধ্যে দুইজনের জামায়াতে ইসলামী ও বাংলাদেশ খেলাফতে মজলিসের রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।এদিকে, আসামিদের "কাউকে খুঁজে না পাওয়ায়" গ্রেফতার করা যায়নি বলে জানিয়েছেন দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান।
যদিও বৃহস্পতিবার বেলা পৌনে ১১টার দিকেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে সক্রিয় ছিলেন মামলার এক নম্বর আসামি মুহাম্মদ খাজা আহমেদ। তিনি জেলা ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি এবং বর্তমানে স্থানীয় জামায়াতের সাথে যুক্ত।
নিজেকে নির্দোষ দাবি করে ঘটনার দিন থেকেই খাজা আহমেদের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে একের পর এক পোস্ট করতে দেখা গেছে।অন্যদিকে স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, মামলার পরদিনও দুই নম্বর আসামি আসাদুজ্জামানকে স্থানীয় একটি মসজিদে ইমামতি করতে দেখা গেছে। তিনি দৌলতপুর উপজেলা বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি পদে আছেন।
এদিকে, হত্যাকাণ্ডে তাদের কারও সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেছে উপজেলা জামায়াতে ইসলামী ও বাংলাদেশ খেলাফতে মজলিস।
হত্যার ঘটনায় তিন দিনেও কাউকে গ্রেফতার কেন করা যায়নি, এমন প্রশ্নের জবাবে দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান বলেন, "আসামিদের খুঁজে পাচ্ছি না, চেষ্টা করতেছি। অভিযান অব্যাহত আছে আমাদের"।
মামলার পরদিনও আসামিদের একজনকে প্রকাশ্যে দেখা যাওয়ার বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, "না, এলাকায় নাই। পাচ্ছি না"।
এ নিয়ে কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বলেন, এই ঘটনার সাথে অনেক মানুষের সংশ্লিষ্টতা থাকায় প্রাথমিক পর্যায়ে 'আইডেন্টিফিকেশন' বা শনাক্তকরণের কাজ চলছে।
"ওই বাসায় তো নিজস্ব কোনো সিসি ক্যামেরা ছিল না। সো পাবলিক যে ভিডিওগুলো ছড়িয়েছে সেগুলো কালেকশন (সংগ্রহ) করতে হচ্ছে। ওখান থেকে আমরা আইডেন্টিফাই করার চেষ্টা করছি," বলেন তিনি।
এছাড়া এক নম্বর আসামির ফেসবুকে সক্রিয় থাকার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন জানান ,"আমাদের তো অনেক লোক বিদেশে থেকেও ফেসবুকে অ্যাক্টিভ। এখন সে কোথা থেকে অ্যাক্টিভ হচ্ছে, সেগুলো নিয়ে আমরা কাজ করছি"।
অন্যদিকে মামলার বাদী ফজলুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, 'শোকাহত' হওয়ায় এ বিষয়ে কিছু বলতে পারছেন না এখন।
তবে প্রথমে মামলা করবেন না বললেও পরবর্তী সময়ে পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথে আলোচনা করে মামলা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন মি. রহমান।
এছাড়া আসামিদের গ্রেফতার না করার বিষয়েও কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।
প্রসঙ্গত, সম্প্রতি পীর পরিচয় দেওয়া আব্দুর রহমানের তিন বছর আগের একটি ভিডিও'র কাটছাঁট অংশ ছড়িয়ে দেওয়া হয় সামাজিক মাধ্যমে।তারই সূত্র ধরে কোরআন অবমাননার অভিযোগ এনে শনিবার দুপুরের দিকে স্থানীয় একদল লোক একত্রিত হয়ে 'শামীম বাবার দরবার শরিফ' এ হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ চালায়।
পরে আহত অবস্থায় তিনজনকে দৌলতপুরের থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়।
সেখানকার দায়িত্বরত চিকিৎসক জানিয়েছিলেন, আহত অবস্থায় তিনজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনার ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, হাতে লাঠিসোটা নিয়ে কয়েকশ লোক ওই দরবারে প্রথমে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। পরে সেখানে আগুন ধরিয়ে দেয়।