গোয়ালন্দে কোটি টাকার রাস্তায় নিন্মমানের সামগ্রী ব্যাবহারের অভিযোগ
রাস্তার উপর রাখা হয়েছে পাথর মনে হচ্ছে এটা দিয়েই নির্মান করা হচ্ছে গাইড ওয়ালের কাজ কিন্তু কাছে গেলেই চোখ ছানাবড়া। পাথরের নিচে লুকানো খোয়ার রাবিশ সেটা দিয়েই চলছে ঢালাইয়ের কাজ। রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) আওতায় নির্মাণাধীন একটি সড়ক বারবার স্থানীয়দের অভিযোগ এবং জাতীয় পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পরও এভাবেই চলছে রাস্তার কাজ।
ঘটনার সত্যতা মুঠোফোনে স্বীকার করেন বর্তমান ঠিকাদার সোবহান, তিনি বলেন আপনারা যা দেখছেন সত্য পাথরের নিচে খোয়া রেখে খোয়া দিয়েই কাজ করা হচ্ছে। তবে এই কাজ করা হচ্ছে গোয়ালন্দ উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তার নির্দেশে তারা না বললে আমরা একাজ করার সাহস পেতাম না বলে তিনি জানান। তবে তিনি এই প্রতিনিধিকে একসাথে চা খাওয়ার অফার করেন।
উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী মোঃ শহিদুল ইসলাম বলেন, আজ বন্ধের দিন হওয়ার সুযোগে তারা এই অপকর্ম করছে বলে জানান। এছাড়া তার নির্দেশে এমন কাজ হচ্ছে এমন অভিযোগের বিষয়টি অস্বীকার করেন তিনি।
উপজেলার উজানচর ইউনিয়নের নতুনপাড়া এলাকায় পৌরসভার ময়লা ফেলার ডাম্পিং স্টেশনে যাতায়াতের জন্য নির্মিত ১ কোটি ৬০ লক্ষ টাকার সড়ক নির্মাণ কাজে অনিয়ম ও নির্মান কাজে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়রা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিষয়টি বার বার জানালেও এ ব্যাপারে কোনই পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর সহযোগিতায় ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান এরকম অনিয়ম করে চলেছে। এছাড়া কার্যাদেশ পাওয়া ঠিকাদারের কাছ থেকে কমমূল্যে প্রকল্পটি বেঁচা কেনা হবার বিষয়টি ওপেন সিক্রেট। তবে এবিষয়ে কোনই ব্যবস্থা নেয়নি সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ৫৬০ মিটার দৈর্ঘ্যের এই সড়ক ও প্যালাসাইডিং (গাইড ওয়াল) নির্মাণকাজের দায়িত্ব পায় বিসমিল্লাহ ট্রেডার্স। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে স্থানীয়ভাবে রাজবাড়ীর সুবাহান নামে এক ঠিকাদার কাজটি পরিচালনা করছেন। তারা অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি নির্মাণকাজে নিয়মনীতি উপেক্ষা করে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করছেন।
গত ৪ মে ২/৩ নম্বর ইট দিয়ে কাজ হচ্ছে শিরোনামে নিউজ হলে তৎকালীন ইউএনও এর হস্তক্ষেপে নামমাত্র ইট পরিবর্তন করা হয়েছিল। সবাইকে ইট পরিবর্তন দেখানো হলেও সেই পুরাতন ইট দিয়েই কাজ হয়েছিল বলে জানান স্থানীয়রা।
এরপর গত ১৫ ও ১৬ জুলাই প্রায় সবগুলো জাতীয় পত্রিকায় নিউজ প্রকাশিত হয় গাইড ওয়াল ও রাস্তার অনিয়ম নিয়ে সেই সময় সাময়িক বন্ধ থাকার পর আবারও রাস্তার কাজ শুরু হয় উপজেলা প্রকৌশলীর হস্তক্ষেপে। এখানে চুরি নয় যেন পুকুর চুরি হচ্ছে। প্রকল্পটির কাজ চলতি বছরের এপ্রিল মাসে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনও নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। এরই মধ্যে কয়েক দফা সংবাদ প্রকাশিত হলেও সংশ্লিষ্টদের কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ার অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।
গতকাল বুধবার ( ২৬ জুলাই) সরজমিনে গেলে দেখা যায় রাস্তার একটু পর পর পাথর নামানো কিন্তু ঢালাইয়ের ওখানে গেলেই দেখা যায় খোয়ার রাবিশ এবং সেটা দিয়েই ঢালাই দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ নিন্মমানের খোয়া রেখে তার উপর পাথর বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে যাতে মানুষ বুঝে পাথর দিয়ে ঢালাই হচ্ছে। এতো বড় প্রতারণা করলেও এই রাস্তা নির্মানের সময় কখনোই পাওয়া যায়নি স্থানীয় প্রকৌশলী অফিসের কাউকেই।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রকৌশলী অফিসের এক কর্মকর্তা জানান ওখানে যাওয়ার উপায় নাই যিনি কাজ পেয়েছেন তার কাছ থেকে জোর করে কাজ নিয়ে একজন কাজ করছেন। তিনি মন্ত্রীর লোক পরিচয় দিয়ে জোর করে কাজ করছেন তিনি আমাদের কথা শুনেন না। তাই অফিসের কেউ সেখানে যায় না।
স্থানীয় বাসিন্দা ইমরান হোসেন বলেন, পুরো কাজটাই নিয়মবহির্ভূতভাবে করা হয়েছে। রাস্তার পিচ উঠে যাচ্ছে। শুনেছিলাম খোয়া ও পাথর দিয়ে মজবুত ভিত্তি করা হবে, কিন্তু সেখানে বেশি বালু ব্যবহার করা হয়েছে। গাইড ওয়ালেও শুধু ইটের ওপর সিমেন্ট-বালুর প্রলেপ দেওয়া হয়েছে, কোথাও রড ব্যবহার করা হয়নি। এছাড়া প্রথমে রাবিশ রেখে তার উপর পাথর দিয়েছে তবে কাজ সেই রাবিশ দিয়ে করছে আর এর সহায়তা করছে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতা।
স্থানীয় আরেক বাসিন্দা রাজিব সরদার জানান, রাস্তার কাজের শুরু থেকেই অনিয়ম হয়েছে দুই নম্বর ইট, নির্মান করার পর থেকেই রাস্তার উপর থেকে উঠে যাচ্ছে পিচ এছাড়া গাইড ওয়াল ফাটল সহ কোন কাজই ভালো হয়নি। এলাকা বাসী বারবার বাঁধা দিলেও কোন কথা শুনে নাই বরং ভয় ভীতি দেখিয়ে কাজ শেষ করতে চাচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্পের সিডিউল অনুযায়ী গাইড ওয়াল নির্মাণে নিচ থেকে ৫০০ মিলিমিটার উচ্চতা পর্যন্ত ৩৭৬ মিলিমিটার পুরু ইটের গাঁথুনি, পরবর্তী ৫০০ মিলিমিটার অংশে ২৫০ মিলিমিটার পুরু গাঁথুনি, প্রতি ৩ মিটার অন্তর ১৫০×১৫০ মিলিমিটার প্রি-কাস্ট আরসিসি পোস্ট এবং ২০০×১৫০ মিলিমিটার ক্যাপিং বিম নির্মাণের কথা থাকলেও বাস্তবে এসব নির্দেশনা অনুসরণ করা হয়নি। এছাড়া সিডিউল অনুযায়ী প্যালাসাইডিং যেখানে নির্ধারিত দূরত্বে করার কথা, সেখানে তা অনেক কম দূরত্বে নির্মাণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ।
তাদের আরও অভিযোগ, কার্পেটিংয়ের আগে নিয়ম অনুযায়ী প্রাইম কোট ব্যবহার না করে অল্প পরিমাণ ট্যাক কোট প্রয়োগ করায় ইতোমধ্যেই সড়কের বিভিন্ন স্থানে পিচ উঠে যেতে শুরু করেছে।স্থানীয়রা জানান, রাস্তার পাশেই মরা পদ্মা নদী থাকায় এখানে শক্তিশালী প্যালাসাইডিং অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল। কিন্তু নিম্নমানের নির্মাণের কারণে বর্ষা মৌসুমেই নতুন সড়কটি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর আগেও একই স্থানে নির্মিত একটি সড়ক এক বছরের মধ্যেই ভেঙে যায়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল হুদা বলেন, অভিযোগ পাওয়ার সাথে সাথে পৌর ইন্জিনিয়ার এবং জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রকৌশলীকে জানানো হয়েছে। এখানে নিয়মের বাইরে কাজ করার কোন সুযোগ নেই। অনিয়ম হলে যথাযথ ব্যাবস্থা নেওয়া হবে।