কিশোরগঞ্জের ভৈরব রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দুই এলাকার বাসিন্দাদের সংঘর্ষের ঘটনায় গতকাল বৃহস্পতিবার প্রায় পৌনে পাঁচ ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল। পরে দিবাগত রাত ১টা ৪৫ মিনিটে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে ট্রেন চলাচল শুরু হয়। এ ঘটনায় চারটি আন্তনগর ট্রেনসহ একাধিক ট্রেনের কয়েক হাজার যাত্রী চরম দুর্ভোগে পড়েন। বিশেষ করে বিদেশগামী যাত্রীরা বিপাকে পড়েন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এক সপ্তাহ আগে ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধের জেরে গতকাল রাত ৯টার দিকে পৌর শহরের জগন্নাথপুর ও পঞ্চবটি এলাকার লোকজনের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। ভৈরব রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে এ সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে ছয় পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ৩০ জন আহত হন। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ট্রেন চলাচল নিয়ন্ত্রণকক্ষ, রেলওয়ে থানা ও প্ল্যাটফর্মের ভেতরের কয়েকটি দোকান।
রাত ৯টা থেকে দিবাগত রাত ১টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত কোনো ট্রেন ভৈরব রেলস্টেশন অতিক্রম করতে পারেনি। এতে ঢাকা–চট্টগ্রাম, ঢাকা–সিলেট, ঢাকা–নোয়াখালী, ভৈরব–কিশোরগঞ্জ ও ময়মনসিংহ–চট্টগ্রাম রুটে ট্রেন চলাচলে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে র্যাব, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা যৌথভাবে অভিযান চালান। দিবাগত রাত দেড়টার দিকে তাঁরা পুরো প্ল্যাটফর্মের নিয়ন্ত্রণ নেন। সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে আহত হন ভৈরব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতাউর রহমান আকন্দ, জ্যেষ্ঠ উপপরিদর্শক (এসআই) এমদাদুল কবির, ভৈরব রেলওয়ে থানার ওসি মোহাম্মদ সাঈদ আহমেদ, উপপরিদর্শক (এসআই) জহিরুল ইসলাম, কনস্টেবল সারোয়ার আহমেদ ও আরএনবির হাবিলদার মুছা মিয়া। তাঁরা পাথরের আঘাতে আহত হন। তাঁদের মধ্যে সারোয়ার আহমেদকে কিশোরগঞ্জের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাঁর একটি পা ভেঙে গেছে।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, গোলমালের কারণে ঢাকাগামী মহানগর এক্সপ্রেস আশুগঞ্জ রেলস্টেশনে, পারাবত এক্সপ্রেস তালশহর স্টেশনে, এগারসিন্ধুর এক্সপ্রেস দৌলতকান্দি স্টেশনে, চট্টগ্রামগামী মহানগর এক্সপ্রেস নরসিংদী স্টেশনে, নরসিংদী কমিউটার খানাবাড়ি স্টেশনে ও একটি কনটেইনার ট্রেন মেথিকান্দা রেলস্টেশনে দীর্ঘ সময় আটকে ছিল। গভীর রাত পর্যন্ত ট্রেনগুলো থেমে থাকায় যাত্রীরা অসহায় অবস্থায় পড়েন।
গণমাধ্যমকর্মী ফারুক আহমেদের বাড়ি কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলায়। তিনি ঢাকায় থাকেন। বাড়ি যাওয়ার জন্য এগারসিন্ধুর এক্সপ্রেসে উঠেছিলেন। ভুক্তভোগী ফারুক আহমেদ বলেন, ‘সাড়ে চার ঘণ্টার অধিক সময় থামানো ট্রেনে ছিলাম। প্রচণ্ড গরম, প্রচুর ভিড়। খুবই কষ্টের ছিল। শত শত যাত্রী অসহায় হয়ে পড়েন। সবচেয়ে বড় সমস্যা ট্রেন কখন ছাড়বে—এই তথ্য কারও জানা ছিল না। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনিশ্চয়তাও বাড়ছিল, ভয় পাচ্ছিলাম।’
এদিকে বিদেশগামী যাত্রীদের ফ্লাইট ধরাতে ভৈরবের একদল তরুণ এগিয়ে আসেন। তাঁরা আশুগঞ্জে আটকে থাকা মহানগর এক্সপ্রেসের বিদেশগামী যাত্রীদের ভৈরবে এনে সড়কপথে ঢাকায় পাঠানোর উদ্যোগ নেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, জগন্নাথপুর ও পঞ্চবটি এলাকা ভৈরব রেলস্টেশন লাগোয়া। প্ল্যাটফর্মের ভেতর ও বাইরের শতাধিক দোকানের বেশির ভাগই ওই দুই এলাকার লোকজনের নিয়ন্ত্রণে। এক সপ্তাহ আগে ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে দুই এলাকার কয়েকজন যুবকের মধ্যে মারামারি হয়েছিল। গতকাল সন্ধ্যায় জগন্নাথপুর এলাকার সোহেল মিয়ার ছেলে লিমন মিয়াকে প্ল্যাটফর্মে পেয়ে আগের ঘটনার জেরে পঞ্চবটির কয়েকজন মারধর করেন। এরপর দুই এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং রাত ৯টার দিকে দুই পক্ষ লাঠিসোঁটা নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।