চোখেমুখে ছিল পবিত্র কোরআনের হাফেজা হওয়ার এক বুক স্বপ্ন। ১৮টি পারা ইতিমধ্যে গেঁথে নিয়েছিলেন হৃদয়ে। বাকি ছিল আর মাত্র ১২ পারা। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূর্ণ হওয়ার আগেই পদ্মার অথৈ জল কেড়ে নিল ১৩ বছরের কিশোরী আয়েশা বিনতে গিয়াসকে। দৌলতদিয়া ঘাটে বাস ডুবির সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় পরিবারের আদরের আয়েশা এখন শায়িত আছেন কুষ্টিয়ার খোকসার পারিবারিক কবরস্থানে।
গত বুধবার (২৫ মার্চ) বিকেলে দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে পন্টুন থেকে বাসটি যখন দ্রুতগতিতে পদ্মায় তলিয়ে যাচ্ছিল, তীরে দাঁড়িয়ে থাকা বাবা গিয়াস উদ্দিন আর ভাই সাফিনের চোখের সামনেই মুহূর্তেই সব অন্ধকার হয়ে যায়। মা লিটা খাতুনকে অলৌকিকভাবে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও, ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে তলিয়ে যায় আয়েশা।
আয়েশার বাবা ও ভাই দুজনেই কোরআনের হাফেজ। বাবার ইচ্ছা ছিল মেয়েকেও হাফেজা বানাবেন। সে লক্ষ্যেই মাদ্রাসায় পড়াশোনা করছিল সে। মেধাবী আয়েশা মাত্র ১৩ বছর বয়সেই কোরআনের অর্ধেকের বেশি মুখস্থ করে ফেলেছিল।
গত রমজানেই পরিবারের সঙ্গে ওমরাহ করে ৫ রমজানে ফিরে আসা আয়েশা ছিল পাঁচ ভাইয়ের পরিবারের মাত্র দুই মেয়ের একজন। সবার চোখের মণি আয়েশার এই অকাল প্রস্থান মেনে নিতে পারছেন না তার স্বজনরা।
আয়েশা বিনতে গিয়াসের সেজ চাচা নাসির উদ্দিন
কুষ্টিয়ার খোকসা শমসপুর মোল্লাপাড়ার নিজ বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে আলাপ চারিতায় বলেছেন, পরিবারের সবচেয়ে আদরের মেয়েটিকে হারিয়ে পুরো পরিবার এখন দিশেহারা। “আমাদের পরিবারে মোট ৫জন হাফেজ ওর বাবা আর ভাই দুজনেই হাফেজ। আয়েশারও খুব ইচ্ছা ছিল সে হাফেজা হবে। ইতিমধ্যে ১৮ পারা কোরআন মুখস্থও করে ফেলেছিল মেয়েটা। বাকি ছিল আর মাত্র ১২ পারা। গত রমজানে ৫ রোজার সময় সপরিবারে ওমরাহ করে এলো, কত খুশি ছিল ও! পড়ালেখাতেও ও খুব মেধাবী ছিল। ” তিনি আরও বলেছেন, “বাবার পাঁচ ভাইয়ের সংসারে মাত্র দুইজন মেয়ে। আয়েশা ছিল সবার জানের জান। বড় চাচার কবরের পাশেই ওকে জায়গা দিয়েছি আমরা।
ও এখন ওর বড় চাচার কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত। ১৮ পারা কোরআন তো ওর হৃদয়েই ছিল, বাকি ১২ পারা পূর্ণ করার সুযোগ আর দিল না পদ্মা নদী।”
গিয়াস উদ্দিনের ঢাকায় একটি ফুড প্রোডাক্ট কোম্পানি রয়েছে। ঈদের ছুটিতে সপরিবারে খোকসার নিজের বাড়ি ও কুমারখালীর শ্বশুরবাড়ি বেড়াতে এসেছিলেন। বুধবার দুপুরে কুমারখালী পৌর বাস টার্মিনাল থেকে ‘সৌহার্দ্য পরিবহনের’ বাসে করে তারা ফিরছিলেন ঢাকায়। বাসটি ফেরির অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় নামাজ পড়ার জন্য গিয়াস উদ্দিন তার ছেলেকে নিয়ে বাস থেকে নামেন। বাসে রয়ে যান স্ত্রী ও কন্যা। এর কয়েক মিনিটের মধ্যেই বাসটি পন্টুন দিকে ছুটে গিয়ে সরাসরি পদ্মা নদীতে পড়ে যায়।
পিতা গিয়াস উদ্দিন বলেছেন, “চোখের সামনে স্ত্রী আর মেয়েকে নিয়ে বাসটা ডুবে গেল। কিছুই করতে পারলাম না। পরে স্ত্রীকে লোকজনের সাহায্যে উদ্ধার করতে পারলেও মেয়েটা হারিয়ে গেল।” গভীর রাতে ডুবুরিরা যখন আয়েশার নিথর দেহ উদ্ধার করে, তখন আমার সব আশার প্রদীপ নিভে যায়।
বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) সকালে জানাজা শেষে শমসপুর মোল্লাপাড়ার বাড়িতে আয়েশাকে দাফন করা হয়েছে।
আয়েশার অকাল মৃত্যুতে শুধু তার পরিবার নয়, পুরো এলাকায় বইছে শোকের মাতম।
এ দুর্ঘটনায় আয়েশাসহ সর্বশেষ ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তারমধ্যে ১১ জন নারী, ৮জন শিশু ও ৭ জন পুরুষ রয়েছেন। যাদের মধ্যে কুষ্টিয়া জেলার শিশুসহ ৪ জন যাত্রী নিহত হয়েছেন।
তারা হলেন, কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার সমসপুর গ্রামের গিয়াসউদ্দিন রিপনের মেয়ে আয়েশা বিনতে গিয়াস (১৩), ইউনিয়নের ধুশুন্ডি গ্রামের দেলোয়ার হোসেনের ছেলে ইসরাফিল (৩), একই উপজেলার বেতবাড়িয়া ইউনিয়নের খাগড়বাড়িয়ার হিমাংশু বিশ্বাসের ছেলে রাজীব বিশ্বাস (২৮), কুষ্টিয়া পৌর এলাকার মজমপুরের মো. আবু বক্কর সিদ্দিকের স্ত্রী মর্জিনা খাতুন (৫৬)।