বাগেরহাটের রামপালে দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগে প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা স্টান্ড রিলিজ
এ এইচ নান্টু, নিজস্ব প্রতিবেদক || বাগেরহাটের রামপালে আলোচিত প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. ফরহাদ আলী অবশেষে তাৎকানিকভাবে বদলীর আদেশ হয়েছে। দুর্নীতি আর অনিয়মে অকুণ্ঠ নিমজ্জিত ওই কর্মকর্তার দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে ঝিনাইদহ জেলার কোটচাঁদপুর উপজেলায় বদলী করা হয়েছে। বিভিন্ন খাত থেকে মোটা অংকের টাকা লুটপাট ও শিক্ষকদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণসহ স্বেচ্ছাচারিতার কারণে শিক্ষা ব্যাবস্থায় নৈরাজ্য সৃষ্টি করায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় সৃষ্টি হয়। তদন্তের সার্থে তাকে স্টান্ড রিলিজ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
জানা গেছে, শিক্ষা কর্তা ফরহাদ আলী কর্মস্থলে যোগদানের পর থেকেই শুরু করেন স্বেচ্ছাচারিতা। তার এমন নানাবিধ কর্মকান্ডে অতিষ্ঠ হয়ে প্রতিকার ও শাস্তির দাবি জানিয়ে একটি দরখাস্ত করেছিলেন বাগেরহাট জেলা শিক্ষা অফিস বরাবর। এই ঘটনায় ইতিমধ্যে তদন্তও শুরু করেছেন বাগেরহাট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস। শিক্ষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, উপজেলার ১২৭ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে অধিকাংশ বিদ্যালয়ই প্রতিষ্ঠানের প্রধানগণের সাথে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের অন্তঃকোন্দল প্রভাব ফেলেছে শিক্ষাঙ্গনে। এতে করে শিক্ষকদের পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। তিনি ঘুষ, দূর্নীতি ও ভয়ভীতিসহ শিক্ষকদের রাখেন নানাবিধ আতংকের মধ্যে। তার কথার অবাধ্য হলেই শাস্তি হিসেবে পেতে হয় শোকজ লেটার। যা পরে রূপ নেয় বকশিসে। থেমে যায় ওই শোকজ লেটার। এভাবেই ব্যাপক পরিচিত পান রামপাল উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. ফরহাদ আলী।
প্রতি বছর সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলোতে স্কুল লেভেল ইমপ্রুভমেন্ট প্ল্যান (স্লিপ) এর জন্য উপজেলা শিক্ষা অফিসের মাধ্যমে প্রতিটি স্কুলে প্রায় ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়। নিয়ম অনুযায়ী বরাদ্দকৃত ওই টাকা থেকে ১৫% হারে ভ্যাট ও আইটি কর্তন করে স্ব স্ব প্রতিষ্ঠানের ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে ব্যাংকে জমা দিতে হয়। কিন্তু উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. ফরহাদ আলী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ২০ ভাগ হারে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে উপজেলা সহকারী শিক্ষা অফিসারদের মাধ্যমে অগ্রিম নগদ টাকা উত্তোলন করেছেন। হিসাব অনুযায়ী ১২৭টি স্কুলের মোট বরাদ্দ থেকে ২০ ভাগ হারে ক্লাস্টারের মাধ্যমে নগদ উত্তোলন করেছেন প্রায় ১২ লক্ষ ৮৯ হাজার ৩০৪ টাকা। আর সরকারি কোষাগারে জমা দিয়েছেন ৯ লক্ষ ৫৩ হাজার ৭৭১ টাকা। অর্থাৎ সর্বমোট লোপাটের অর্থ ৩ লক্ষ ৩৫ হাজার ৫৩৩ টাকা।
এছাড়াও সরকারি নির্দেশনা ছাড়া প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণীর পরিক্ষা নিতে ৩টি প্রশ্নে প্রতি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া হয় ১২ টাকা করে। যার আনুমানিক খরচ মাত্র ৩ থেকে ৪ টাকা। অর্থাৎ জন প্রতি বাড়তি আদায় করা হয় ৮ টাকা করে। এখানেও দেখা যায় বাড়তি টাকা আত্মসাৎ করেছেন তিনি।
এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে ওই শিক্ষা কর্মকর্তা মো. ফরহাদ আলী মোটা অংকের টাকার বিনিময় সুখেন্দু অধিকারী নামের এক সহকারী শিক্ষককে প্রতিবন্ধি দেখিয়ে বদলি করেছেন। ওই শিক্ষক সড়ক দুর্ঘটনায় সামান্য আহত হলেও তাকে প্রতিবন্ধি দেখিয়ে বদলির আবেদন করলে কোন নিয়মের তোয়াক্কা না করেই বদলি করেন তিনি। অথচ নিয়মঅনুযায়ী সমাজসেবা কার্যালয় থেকে প্রথমে প্রতিবন্ধির প্রত্যয়ন নিতে হবে, তবেই ওই ব্যক্তিই প্রকৃত প্রতিবন্ধি বলে বিবেচিত হবেন। তৎকালীন উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান ওই শিক্ষকের আবেদনটি ত্রুটিপূর্ন বলে সত্যায়িত করলেও অদৃশ্য ক্ষমতা বলে মো. ফরহাদ আলী ওই শিক্ষককে বদলি করেছেন অন্যত্র।
অভিযোগ রয়েছে ওই শিক্ষা কর্মকর্তা ও উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা মো. ফারুকুল ইসলাম ও সরোজ কুমার রায়সহ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা নিয়মিত অফিস আসেন না। অথচ পরবর্তীতে হাজিরা খাতায় সই করে দেখান তারা অফিস করেন নিয়মিত। এছাড়াও প্রাথমিক ওই শিক্ষা কর্মকর্তা বিভিন্ন শিক্ষকদের পূর্ববর্তী কর্মস্থলে যোগদান দেওয়ার কথা বলে টাকা নেওয়া, বিভিন্ন দিবসে প্যানা বাবদ ৫ শত করে টাকা নেওয়া (যার খরচ আনুমানিক ২৪০টাকা)। অর্থাৎ ১২৭×৫০০= ৬৩ হাজার ৫ শত টাকা। মূল খরচ ১২৭× ২৪০= ৩০ হাজার ৪৮০ টাকা। অতিরিক্ত আদায় ৩৩ হাজার ২০ টাকা। এভাবেই চতুর ওই শিক্ষা কর্তা বিভিন্ন খাত থেকে অবৈধভাবে অর্থ আত্মসাতের মাধ্যমে আঙুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছেন।
মূলতঃ রামপাল সদর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল মান্নান ও তার স্ত্রী ভাগা বেতকাটা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা নিলুফসহ বেশ কয়েকজন তার দুর্নীতিতে সহায়তা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এঁরাই বিভিন্ন তথ্য সরবরাহ ও সহায়তার মাধ্যমে একটা সিন্ডিকেট তৈরি করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
রামপাল উপজেলা শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও উত্তর হুড়কা সপ্রাবি'র প্রধান শিক্ষক মো. ইজাদুল হক, বাইনতলা কাশিপুর সপ্রাবি'র প্রধান শিক্ষক তাপস পাল, দেবীপুর সপ্রাবি'র প্রধান শিক্ষক মাহমুদ হোসেন, মুজিবনগর সপ্রাবি'র প্রধান শিক্ষক হাওলাদার জাকির হোসেন, ভুঁইয়ার কান্দন সপ্রাবি'র প্রধান শিক্ষক মনিরুল ইসলাম, পশ্চিম গোবিন্দপুর সপ্রাবি'র প্রধান শিক্ষক সখিনা আক্তার, চাকশ্রী সপ্রাবি'র প্রধান শিক্ষক কাজী মোহাম্মদ আলী ও ঝনঝনিয়া সপ্রাবি'র প্রধান শিক্ষক খান হায়দার আলী জানান,
রামপালে শিক্ষার মান উন্নয়নে শিক্ষা কর্মকর্তা ও শিক্ষকদের এই অন্তঃকোন্দল প্রভাব ফেলেছে শিক্ষাঙ্গনেও। ক্ষোভ আর আতংকে সকল শিক্ষকরা নাজেহাল। তারা দূর্নীতিবাজ এই শিক্ষা অফিসারকে দ্রুত আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানান।
এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. ফরহাদ আলী সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমি মানুষিকভাবে খুবই দূর্বল। পারিবারিক নানা সমস্যায় আমি চিন্তিত। আমি দায়িত্ব নিয়ে আমার দায়িত্ব পালন করি। অর্থ আত্মসাৎ বা শিক্ষকদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ এটা আমি কখনোই করিনি। আমি চেষ্টা করেছি শিক্ষাঙ্গনে আরো উন্নতি করার। সেক্ষেত্রে অনেক সময় আমি হার্ড হয়েছি, হয়তো তখন কেউ ক্ষুব্ধ হতে পারে। তবুও আমার কর্মকান্ডে কেউ কষ্ট বা ব্যথিত হলে আমি ক্ষমা চাচ্ছি।
এবিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. আমিনুল ইসলাম জানান, একটি বেনামী দরখাস্ত পেয়েছি। সেই বিষয়ে আমরা তদন্ত শুরু করেছি। শিক্ষাঙ্গনে কোনো ধরনের অনিয়ম ও দূর্নীতির সুযোগ নেই। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।