রাস্তাসহ বসতবাড়ি রক্ষায় ইজারা বাতিলের দাবি
লক্ষাধিক মানুষের গলার কাঁটা জুগিয়া বালুমহাল, চালুর চেষ্টাকে ঘিরে অস্ত্রের মহড়া ও গুলিবর্ষণের অভিযোগ ইজারাদার বসির উদ্দিনের বিরুদ্ধে
নিজস্ব প্রতিবেদক
কুষ্টিয়া পৌরসভার ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের জুগিয়া বালুমহাল চালু করাকে কেন্দ্র করে আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে এলাকা। বালুমহাল চালুর বিরোধিতাকারী স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ইজারাদারপক্ষের লোকজনের সঙ্গে বিরোধের জেরে এলাকায় একাধিকবার প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া, ফাঁকা গুলিবর্ষণ, হামলা ও যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ গতকাল সন্ধ্যায়ও গুলিবর্ষণের ঘটনায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে এলাকাজুড়ে।
এ অবস্থায় জনবসতিপূর্ণ এলাকার সড়ক ও বসতবাড়ি রক্ষায় জুগিয়া বালুমহালের ইজারা বাতিলের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের আশঙ্কা, বালুমহালটি চালু হলে ভারী যানবাহনে বালু পরিবহনের কারণে এলাকার সড়কগুলো আবারও চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়বে। পাশাপাশি নদীভাঙন ও বসতবাড়ির নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে তাঁদের।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, জুগিয়া হাটপাড়া, ভাটাপাড়াসহ ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের আশপাশের এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বালু পরিবহনের বড় বড় ড্রাম ট্রাক চলাচল করায় রাস্তাঘাটের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বর্ষা মৌসুমে এসব সড়কে পায়ে হেঁটে চলাচল করাও কঠিন হয়ে পড়ে। দীর্ঘদিনের দাবির পর জুগিয়া হাটপাড়া থেকে কুষ্টিয়া-ত্রিমোহনী সড়কের কানাবিলের মোড় পর্যন্ত সড়ক পুনর্র্নিমাণের কাজ শুরু হলে সেখানে ভারী যানবাহন চলাচলে বাধা দেন এলাকাবাসী। এরপরই বালুমহাল চালু করা নিয়ে বিরোধ তীব্র হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বালুমহালের ইজারাদার বসির এন্টারপ্রাইজের মালিক বসির উদ্দিন ও খন্দকার মোখলেচুর রহমান স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের কয়েকজন নেতাকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে বালুমহালটি চালুর চেষ্টা করছেন। তবে তাঁদের এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এলাকাবাসীর দাবি, বালুমহালটি দীর্ঘদিন চালু থাকাকালে বিপুল পরিমাণ বালু উত্তোলন ও পরিবহনের ফলে তাঁদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়েছে। বালু উত্তোলনের পরিমাণ, রাজস্ব আদায় এবং পরিবেশ ও অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্তেরও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বালুমহালটির কার্যক্রমের সঙ্গে সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর মইদুল ইসলামের সংশ্লিষ্টতা ছিল। তাঁরা আরও দাবি করেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রভাব খাটিয়ে বালুমহালটি ঘিরে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা নথি পাওয়া যায়নি।
৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সাবেক কাউন্সিলর মইদুল ইসলাম আত্মগোপনে রয়েছেন বলে স্থানীয়দের দাবি। এরপর তাঁর সহযোগী হিসেবে পরিচিত কয়েকজনের উদ্যোগে বালুমহালটি নতুন করে চালুর চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তাঁদের মধ্যে ১৫ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক শাফিন আহম্মেদ, ওয়ার্ড যুবলীগের সদস্য মো. রাকিব, ফারুক ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক বিপুলের নাম উল্লেখ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের সঙ্গে আরও ১৫ থেকে ২০ জন নেতাকর্মী রয়েছেন বলেও দাবি করা হয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বালুমহাল চালু করা নিয়ে বিরোধের জেরে গত ২১ জানুয়ারি রাতে একদল অস্ত্রধারী সেখানে গিয়ে ১০ থেকে ১৫ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে। ওই ঘটনায় একজন গুলিবিদ্ধ হন এবং আরেকজনের হাতের একটি অংশ কেটে গুরুতর জখম হওয়ার খবর পাওয়া যায়। পরে ঘটনাস্থল থেকে একটি শটগানের অব্যবহৃত দুই রাউন্ড তাজা গুলি ও দুটি গুলির খোসা উদ্ধার করে পুলিশ বলে জানা গেছে।
এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল সন্ধ্যায় আবারও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের অভিযোগ, বালুমহাল চালু করতে বাধা দেওয়ার কারণে এলাকায় ভয়ভীতি সৃষ্টি করা হচ্ছে। তবে সর্বশেষ গুলিবর্ষণের ঘটনায় কারা জড়িত, তা তদন্ত করে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জুগিয়া হাটপাড়া ও ভাটাপাড়ার কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, বালুমহাল চালু হলে ভারী যানবাহনের চাপে তাঁদের এলাকার প্রধান সড়কটি আবারও নষ্ট হয়ে যাবে। এতে শিক্ষার্থী, কর্মজীবী মানুষ, রোগী ও সাধারণ পথচারীদের দুর্ভোগ বাড়বে। তাঁদের দাবি, সড়কটি পুনর্র্নিমাণে সরকারি অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে; অথচ বালু পরিবহনের অনুমতি দেওয়া হলে সেই সড়ক আবারও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাসিন্দাদের আরও আশঙ্কা, নদীতীরবর্তী এলাকায় বালু উত্তোলনের ফলে বসতবাড়ি ও আশপাশের অবকাঠামো ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এ কারণে বালুমহালটির ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া, উত্তোলনযোগ্য এলাকার সীমানা, পরিবেশগত প্রভাব এবং ভারী যানবাহন চলাচলের অনুমোদন যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। একই সঙ্গে জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সরেজমিনে এলাকা পরিদর্শন করে জনস্বার্থ বিবেচনায় ইজারা বাতিলের আহ্বান জানিয়েছেন।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, বিরোধের অবসান না হলে যেকোনো সময় বড় ধরনের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটতে পারে। তাঁরা দ্রুত তদন্ত, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বন্ধ এবং এলাকায় নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে, বালুমহালকেন্দ্রিক গুলিবর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও অস্ত্রের মহড়ার ঘটনায় ইজারাদার বসির উদ্দিনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বক্তব্য জানতে তাঁর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া মেলেনি।
কুষ্টিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাকির হোসেন বলেন, গোলাগুলির ঘটনা তাঁরা শুনেছেন। র্যাব ও পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, জুগিয়া বালুমহালকেন্দ্রিক জেরে এই ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে।