সীমান্তে আবারও স'ক্রি'য় পা'চার'কা'রী চক্র
কুষ্টিয়ার সীমান্তে মাদকবিরোধী অভিযানে চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে ১৬ কোটি ৩২ লাখ টাকার বেশি মূল্যের মাদকদ্রব্য জব্দ করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। একই সময়ে মাদক ছাড়া অন্যান্য চোরাচালানের মালামাল জব্দ করা হয়েছে ১৮ কোটি ৬২ লাখ টাকার বেশি। সব মিলিয়ে জব্দ করা মালামালের মূল্য প্রায় ৩৫ কোটি টাকা। এসব অভিযানে গ্রেপ্তা হয়েছেন ৪৬ জন।
বিজিবির বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধারের পরও সীমান্তবর্তী কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে মাদকের বিস্তার থামছে না। অভিযোগ রয়েছে, সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে দেশে প্রবেশ করা মাদক ছড়িয়ে পড়ছে উপজেলা থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায়। এখন সরাসরি বিক্রির পাশাপাশি মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে ক্রেতার কাছে মাদক পৌঁছে দেওয়ার ‘হোম ডেলিভারি’ ব্যবস্থাও চালু করেছে কারবারিরা।
সীমান্তের দুর্গম চরাঞ্চল, পদ্মা নদীর বিভিন্ন নৌপথ ও নদীভাঙনে পরিবর্তিত সীমান্ত পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে সক্রিয় রয়েছে মাদক পাচারকারী চক্র। ইয়াবা, ট্যাপেন্টাডলসহ বিভিন্ন নেশাজাতীয় ট্যাবলেটের সহজলভ্যতায় তরুণ ও যুবকদের একটি অংশ মাদকের ঝুঁকিতে পড়ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
কুষ্টিয়া ৪৭ বিজিবি ব্যাটালিয়নের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলার সীমান্ত এলাকায় বিভিন্ন অভিযানে ১৬ কোটি ৩২ লাখ ৩৬ হাজার ২৬৫ টাকা মূল্যের মাদকদ্রব্য জব্দ করা হয়েছে। একই সময়ে অন্যান্য চোরাচালানের মালামাল জব্দ করা হয়েছে ১৮ কোটি ৬২ লাখ ৩৭ হাজার ৫৩৫ টাকা মূল্যের। সব মিলিয়ে জব্দ করা মালামালের সিজার মূল্য ৩৪ কোটি ৯৪ লাখ ৭৩ হাজার ৮০০ টাকা ৫০ পয়সা।
জব্দ করা মাদকের মধ্যে রয়েছে ২ হাজার ২৯৮ বোতল বিদেশি মদ, ১ হাজার ১০৪ বোতল ভারতীয় সিনা অ্যালকোহল, ১৯ লিটার দেশি মদ, ২ হাজার ৭৯২ বোতল ফেনসিডিল, ১৪১ দশমিক ৯৩৩ কেজি গাঁজা, ২৫ হাজার ৬২টি ইয়াবা, ২ দশমিক ৩৭১ কেজি হেরোইন, ১২ বোতল এলএসডি, ১ কেজি আফিম ও ২৫০ গ্রাম কোকেন।
এ ছাড়া ২ লাখ ২৪ হাজার ২২৯টি সিপ্রোহেপ্টাডিন ও ডেক্সামেথাসন ট্যাবলেট এবং ৫০ হাজার ৭১৯টি সিলডেনাফিল ট্যাবলেট জব্দ করা হয়েছে।
মাদকবিরোধী অভিযানের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ অন্যান্য চোরাচালানের মালামালও উদ্ধার করেছে বিজিবি। এর মধ্যে রয়েছে ৩ লাখ ৩৮ হাজার ৬১৯ প্যাকেট পাতার বিড়ি, ১ লাখ ১ হাজার ২৩০ প্যাকেট সিগারেট, ৯ লাখ ৫ হাজার সিগারেটের স্ট্যাম্প, ৭টি বিদেশি পিস্তল, ৪টি দেশীয় শুটার গান, ১টি দেশীয় পিস্তল, ১২টি ম্যাগাজিন, ১৫ রাউন্ড গুলি, ৬০ হাজার এয়ারগানের গুলি, ২টি বোমা, ৩টি ককটেল ও ১৫টি দেশীয় অস্ত্র।
এ ছাড়া ৯টি মোটরসাইকেল, ১৮টি মোবাইল ফোন, ৯৪০টি মোবাইলের টাচ বা এলসিডি ডিসপ্লে, ৬ হাজার ৪০ কেজি কারেন্ট জাল, ৪ হাজার ৮৭০ কেজি চায়না জাল, ১ হাজার ২০০ লিটার ডিজেল, ১টি কাভার্ড ভ্যান, ১টি সিএনজি, ভারতীয় সার, কীটনাশক, বীজ, প্রসাধনীসহ বিভিন্ন মালামাল জব্দ করা হয়েছে।
*নদীভাঙনে বদলে যাওয়া সীমান্ত, পাচারের নতুন পথ*
দৌলতপুরের চিলমারী ইউনিয়নের বাংলাবাজার সীমান্ত ও উদয়নগর বিওপি-সংলগ্ন পদ্মা নদীর তীব্র ভাঙনে সীমান্তের বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। নদীর গতিপথ পরিবর্তনের কারণে সীমান্তের কিছু অংশের অবস্থান নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, কয়েকটি এলাকায় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর নিয়মিত টহল কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার সুযোগ নিচ্ছে চোরাকারবারিরা।
এই পরিস্থিতিতে উদয়নগর সীমান্তকে মাদক পাচারের অন্যতম রুট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া আদাবাড়িয়া ইউনিয়নের ধর্মদহ ও পশ্চিম ধর্মদহ, প্রাগপুর ইউনিয়নের জামালপুর ও বিলগাতুয়া, রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের চল্লিশপাড়া ও ভাগযোতসহ পদ্মা নদীর বিভিন্ন নৌপথ দিয়েও মাদক দেশে প্রবেশ করছে বলে দাবি সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর। দৌলতপুরে প্রতি মাসে কয়েক কোটি টাকার মাদকের লেনদেন হয়।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, বর্তমানে মাদক কারবারিদের প্রধান লক্ষ্য ১৭ থেকে ৩৫ বছর বয়সী তরুণ ও যুবকেরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মাদক কারবারির দাবি, ইয়াবা, ট্যাপেন্টাডল ও বিভিন্ন নেশাজাতীয় ট্যাবলেটের চাহিদা বেশি। আকারে ছোট হওয়ায় এসব মাদক সহজে বহন করা যায়। প্রশাসনের নজর এড়াতে সরাসরি বেচাকেনার পরিবর্তে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে ক্রেতার কাছে মাদক পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সীমান্ত এলাকায় বহিরাগত মোটরসাইকেল আরোহী ও অপরিচিত মানুষের আনাগোনা বেড়েছে। বিশেষ করে বিকেল ও সাপ্তাহিক ছুটির দিনে কিছু এলাকায় তরুণদের মাদকসেবনের প্রবণতা চোখে পড়ে। মাদকের সহজলভ্যতার কারণে চুরি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধের ঝুঁকিও বাড়ছে বলে মনে করছেন তাঁরা।
প্রাগপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আশরাফুজ্জামান মুকুল বলেন, “আগের তুলনায় মাদকের বিস্তার বেড়েছে। এখন প্রকাশ্যেই কেনাবেচা হচ্ছে, যার সবচেয়ে বড় শিকার তরুণ সমাজ। প্রতিদিন বিজিবি বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার করছে।”
দৌলতপুর সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মহিউল ইসলাম বলেন, “মাদকের সঙ্গে কারা জড়িত, তা অনেকেই জানেন। এখন প্রয়োজন কঠোর ও কার্যকর ব্যবস্থা।”
*মাদকাসক্তিতে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি*
কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা ( আরএমও)ডা. ইকবাল হোসেন বলেন, “মাদকাসক্তরা আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। পাশাপাশি তারা শারীরিক ও মানসিক জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে, যা সমাজের জন্য বড় হুমকি।”
*অভিযান বাড়ানোর কথা বলছে প্রশাসন*
দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খালেদুর রহমান বলেন, “মাদক প্রতিরোধে সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। আমরা প্রতিনিয়ত কাজ করছি। আমাদের টহল কার্যক্রম বাড়ানো হয়েছে।”
কুষ্টিয়া ৪৭ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাশেদ কামাল রনি বলেন, “সীমান্তে মাদক প্রতিরোধে বিজিবির টহল ও জনবল বৃদ্ধি করা হয়েছে। প্রতিনিয়ত মাদক উদ্ধার হচ্ছে।”
গত বুধবার বিজিবি ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের যৌথ অভিযানে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে চারজন মাদকসেবী ও বিক্রেতাকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
তবে সচেতন নাগরিক ও অভিভাবকদের মতে, শুধু খুচরা বিক্রেতাদের গ্রেপ্তার করে মাদকের বিস্তার রোধ করা সম্ভব নয়। সীমান্ত দিয়ে মাদক প্রবেশের পথ বন্ধ করার পাশাপাশি এর সঙ্গে জড়িত মূল হোতা, সরবরাহকারী ও অর্থের লেনদেনকারীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
বিজিবি, পুলিশ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত ও ধারাবাহিক অভিযান এবং তরুণদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন তাঁরা।
*মাদকাসক্তিতে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি*
কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা ( আরএমও)ডা. ইকবাল হাসান বলেন, “মাদকাসক্তরা আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। পাশাপাশি তারা শারীরিক ও মানসিক জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে, যা সমাজের জন্য বড় হুমকি।”