রূপপুরের পাশেই বালু লুট, ঝুঁকিতে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, হার্ডিং ব্রিজ ও জিকে প্রকল্প।এক পয়েন্টে ঘণ্টায় ৮০ ট্রাক, প্রতিদিন অর্ধকোটি টাকার বালু উত্তোলন# রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে বিভক্ত বিএনপি বালু লুটে একাট্রপদ্মা নদীতে বালু উত্তোলণের কোন ইজারা নেই : জেলা প্রশাসক।
কুষ্টিয়া থেকে: কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার পদ্মা নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ভয়াবহ সিন্ডিকেট। দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মেগা প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অদূরে ড্রেজার বসিয়ে দিনে-রাতে চলছে বালু লুটের মহোৎসব। অভিযোগ উঠেছে, স্বশস্ত্র ক্যাডারদের পাহারায় প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার ট্রাক বালু উত্তোলন করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাচার করা হচ্ছে। এতে প্রতিদিন প্রায় অর্ধকোটি টাকার বালু বাণিজ্য হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, ভেড়ামারা উপজেলার বাহিরচর ইউনিয়নের পুরাতন ফেরিঘাট পয়েন্টে অন্তত ৮ থেকে ১০টি শক্তিশালী ড্রেজার ও ভেকু মেশিন বসিয়ে পদ্মা নদীর চর কেটে অবৈধভাবে ফিলিং বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। নদীর মাঝখানে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে ড্রাম ট্রাক। একদিকে বালু ভর্তি করে ট্রাক ছেড়ে দেয়া হচ্ছে, অন্যদিকে নতুন ট্রাক এসে লাইনে দাঁড়াচ্ছে। মাত্র ৩০ মিনিটে অন্তত ৪২টি ট্রাক বালু ভর্তি করে কুষ্টিয়া-পাবনা মহাসড়কে উঠে যেতে দেখা গেছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের ভাষ্য, প্রতি ঘন্টায় গড়ে ৮০ থেকে ১০০ ট্রাক বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। প্রতিটি ট্রাক বালু দুই হাজার থেকে দুই হাজার দুইশ’ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সেই হিসাবে প্রতিদিন প্রায় অর্ধকোটি টাকার বালু উত্তোলন করে মাসে প্রায় ১৫ কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য চালাচ্ছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, যেখান থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে, তার মাত্র ৯০০ মিটারের মধ্যে অবস্থিত দেশের গুরুত্বপূর্ণ মেগা প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। এছাড়া ৪০০ মিটারের মধ্যে রয়েছে ৪১০ মেগাওয়াট আধুনিক কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প। একইসঙ্গে ৬০০ মিটারের মধ্যে রয়েছে দেশের ঐতিহ্যবাহী হার্ডিং ব্রিজ ও লালন শাহ সেতু। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এভাবে নদীর তলদেশ কেটে বালু উত্তোলন অব্যাহত থাকলে যেকোনো সময় ভয়াবহ নদীভাঙন ও অবকাঠামোগত বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।
স্থানীয়রা জানান, পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে স্বশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী। তাদের অনুমতি ছাড়া ওই অঞ্চলে কেউ প্রবেশ করতে পারে না। প্রশাসন বা গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতি টের পেলেই হামলার চেষ্টা করা হয়। ফলে ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পান না।
জেলার রাজস্ব বিভাগ জানিয়েছে, কুষ্টিয়ার পদ্মা নদীতে বর্তমানে বালু উত্তোলনের কোনো বৈধ ইজারা বা অনুমতি নেই। তারপরও প্রকাশ্যে চলছে ড্রেজার কার্যক্রম।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ইনচার্জ রুহুল কুদ্দুস বলেন, কেপিআই জোনের মধ্যে বালু উত্তোলনের কোনো সুযোগ নেই। নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে বালু উত্তোলন পাশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তাই এসব স্থাপনার আশপাশে বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক বিভক্তি ভুলে স্থানীয় বিএনপির একাধিক গ্রুপ বালু বাণিজ্যে একাট্টা হয়েছে। দ্বিতীয় সারির নেতা ও স্বশস্ত্র ক্যাডাররা সরাসরি মাঠে থাকলেও এর বড় অংশের অর্থ যাচ্ছে শীর্ষ নেতাদের কাছে। যদিও অভিযুক্ত নেতাদের কেউ কেউ সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব শাহজাহান আলী বলেন, যারা অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে তারা অন্য গ্রুপের লোকজন। প্রশাসনকে বারবার ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম ডাবলু বলেন, এভাবে বালু উত্তোলন হলে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রশাসনকে জানিয়েও কোনো কাজ হচ্ছে না।
এ বিষয়ে গবেষক, উদ্ভাবক ও বিজ্ঞানী গৌতম কুমার রায় বলেন, অবাধে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও তলদেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। এতে নদীভাঙন বাড়ছে, জলজ পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে এবং অবকাঠামোগত ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো স্থাপনার কাছে এ ধরনের কার্যক্রম অত্যন্ত বিপজ্জনক।
তিনি আরও বলেন, অপরিকল্পিত ড্রেজিংয়ের ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ও নদীর জীববৈচিত্র্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি জলবায়ু ও পরিবেশগত সংকট আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন-হাসান বলেন, পদ্মা নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে জেলা প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। উপজেলা প্রশাসন ব্যর্থ হলে জেলা প্রশাসন সরাসরি পদক্ষেপ নেবে।
ক্যাপশন : রুপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পাশে পদ্মা নদীতে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে ট্রকে করে লুট করা হচ্ছে বালু।