দারিদ্র্যের কাছে থমকে দুই শিশুর নতুন জীবনের লড়াই কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে বিরল জোড়া লাগা যমজ; চিকিৎসার আশায় সহায়তার আবেদন
দৌলতপুর (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধিঃ
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার প্রাগপুর ইউনিয়নের বিলগাথুয়া গ্রামের এক অসচ্ছল পরিবারের ঘরে জন্ম নেওয়া বিরল জোড়া লাগা (Conjoined Twins) দুই কন্যাশিশুর চিকিৎসা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। চিকিৎসকদের মতে, অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শিশু দুটিকে আলাদা করার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে তার আগে প্রয়োজন ধারাবাহিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিবিড় তত্ত্বাবধান এবং উন্নত চিকিৎসা। আর্থিক সংকটের কারণে সেই চিকিৎসা শুরু করতেই হিমশিম খাচ্ছে পরিবারটি।
গত ৪ মে ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে নাহিদ হাসান ও সানজিদা আক্তার দম্পতির ঘরে জন্ম হয় কন্যাশিশু জয়নব ও উম্মে কুলসুমের। জন্মের পর চিকিৎসকেরা তিন মাস পর পুনরায় ঢাকায় এনে পরবর্তী পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু চরম দারিদ্র্যের কারণে এখনো শিশু দুটিকে ঢাকায় নেওয়া সম্ভব হয়নি।
শিশুদের বাবা নাহিদ হাসান জানান, একসময় রাজধানীর একটি পোশাক কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করলেও বর্তমানে স্থানীয় একটি দোকানে কর্মচারী হিসেবে মাসে মাত্র ৯ থেকে ১০ হাজার টাকা আয় করেন। এই সামান্য আয়ে সংসার চালানোর পাশাপাশি শিশুদের দুধ, ওষুধ ও চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে গিয়ে ঋণের বোঝাও বাড়ছে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “চিকিৎসকেরা আমাদের আশা দিয়েছেন, আমার দুই মেয়েকে আলাদা করা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু সেই চিকিৎসার খরচ বহন করার সামর্থ্য আমার নেই। এখন তাদের দুধ কেনার টাকাই জোগাড় করতে কষ্ট হচ্ছে।
মা সানজিদা আক্তার বলেন, ওদের আলাদা করে কোলে নেওয়া যায় না। একজন নড়াচড়া করলে অন্যজনও কষ্ট পায়। নিয়মিত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় যেতে হবে, কিন্তু যাতায়াত ও পরীক্ষার খরচ জোগানোর সামর্থ্য আমাদের নেই।
শিশুদের স্বজন মাহতাব উদ্দিন বলেন, সরকার, সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও মানবিক সংগঠনগুলো এগিয়ে এলে শিশু দুটির চিকিৎসা সম্ভব হতে পারে। সবার সহযোগিতা পেলে তারা স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।
স্থানীয় চিকিৎসকদের ভাষ্য, জোড়া লাগা যমজ শিশু জন্ম নেওয়া অত্যন্ত বিরল একটি জন্মগত অবস্থা। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে সফল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাদের আলাদা করার নজির রয়েছে। তবে এ ধরনের চিকিৎসার জন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি, অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল এবং উন্নত চিকিৎসা-সুবিধা অপরিহার্য।
প্রাগপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আশরাফুজ্জামান মুকুল বলেন, “পরিবারটি অত্যন্ত অসচ্ছল। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে এনে শিশু দুটির চিকিৎসার জন্য সর্বাত্মক সহযোগিতার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তৌহিদুল হাসান তুহিন বলেন, “চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী দ্রুত পরবর্তী চিকিৎসা শুরু করা জরুরি। সময়মতো পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে থাকলে চিকিৎসার সম্ভাবনা আরও উজ্জ্বল হবে।”
দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিন্দ্য গুহ জানান, উপজেলা সমাজসেবা দপ্তরের মাধ্যমে দ্রুত আর্থিক সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করার বিষয়েও প্রশাসন কাজ করছে।
দারিদ্র্যের কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও নাহিদ-সানজিদা দম্পতির একমাত্র স্বপ্ন—জয়নব ও উম্মে কুলসুম একদিন আলাদা দুটি সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন পাবে। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সমাজের মানবিক ও বিত্তবান মানুষের সহায়তাই হতে পারে তাদের নতুন জীবনের সবচেয়ে বড় আশার আলো।