দুইতলা ভবন বিশিষ্ট দুইটি কোয়ার্টার (আবাসিক ভবন) দীর্ঘদিন ধরে অযত্নে পড়ে আছে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের।
গত দেড় বছর ধরে একটি কোয়ার্টারের তিনটি কক্ষে সপরিবারে বসবাস করছেন হাসপাতালটির পরিচ্ছন্নতাকর্মী পলি খাতুন। বসবাস ছাড়াও তিনি ভবনটির ছাদে বাণিজ্যিকভাবে মুরগির খামার করেছেন। এতে দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ হন হাসপাতালে সেবা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনরা।
সরেজমিন দেখা যায়, হাসপাতাল থেকে প্রায় ৩০ মিটার দূরে জরাজীর্ণ ও প্রায় পরিত্যক্ত দুটি কোয়ার্টার। নির্মাণের ২৩ বছরেও সংস্কার না করায় দুটি ভবনের ৩২টি কক্ষের দেয়াল ও ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ছে। চুরি হয়ে গেছে দরজা জানালার কাঠ ও লোহার উপকরণ। একটি কোয়ার্টারের দ্বিতীয়তলার তিনটি কক্ষে পরিচ্ছন্নতাকর্মী পলি খাতুন তাঁর স্বামী, দুই সন্তান ও নাতি নিয়ে বাস করছেন। ওই ভবনের ছাদের পশ্চিম পাশে টিন, বাঁশ, কাঠ ও প্লাস্টিকের জাল দিয়ে শেড তৈরি করে ব্রয়লার এবং পূর্ব পাশে সোনালি মুরগি পালন করছেন। এদিন হাসপাতালে শিশুসহ নানা বয়সের ১০৫ রোগী ভর্তি রয়েছেন। হাসপাতাল চত্বরের বাতাসে মুরগির বিষ্টার দুর্গন্ধ।
ছেলের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে আসা রোকেয়া বলেন, ছেলে পানি খেতে চাওয়ায় কোয়ার্টারের সামনে টিউবওয়েলের দিকে গিয়েছিলাম।
সেখানে গিয়ে দম বন্ধ হয়ে আসছিল। হাসপাতালের ভেতরে এমন খামার কীভাবে হয় বুঝতে পারছি না। কর্তৃপক্ষ কি কিছুই দেখে না?
এলাকাবাসী ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২০০৩-২০০৪ অর্থবছরে কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি দোতলাবিশিষ্ট কোয়ার্টার নির্মাণ করে গণপূর্ত বিভাগ। বেতন কাঠামোর নীতিমালা অনুযায়ী বেতন কাটার স্বার্থে বসবাস করতে পারবেন হাসপাতালের চাকরিজীবীরা। তবে হাসপাতালের জরাজীর্ণ কোয়ার্টার এবং এটার ভাড়া স্থানীয় বাসাবাড়ির তুলনায় বেশি। সেজন্য কেউ বসবাস করে না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের এক কর্মচারী বলেন, কোয়ার্টারে থাকলে বেতন থেকে প্রতি মাসে ১০-১২ হাজার টাকা কাটা যাবে। অথচ ৫-৬ হাজার টাকায় বাইরে ভালো মানের বাসা পাওয়া যায়। খরচ বেশি হওয়ায় কোয়ার্টারে কেউ থাকে না। এখন ব্যবহারের অনুপযোগী।
হাসপাতালের বারান্দায় শ্বাসকষ্ট নিয়ে ৫ দিন ধরে ভর্তি রয়েছেন ষাটোর্ধ্ব এক বৃদ্ধ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই বৃদ্ধ বলেন, হাসপাতালে সিট নেই। পশ্চিম পাশের বারান্দায় থাকছি। বাতাস উঠলেই মুরগির দুর্গন্ধ নাকে লাগে। হাসপাতালে টেকা যায়না তখন।
রোগীর স্বজন নুনা খাতুন বলেন, হাসপাতালজুড়েই নোংরা আবর্জনা, দুর্গন্ধ। সুস্থ মানুষও অসুস্থ হয়ে পড়ছে। দ্রুত পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি মুরগির ফার্মটির অপসারণ করা দরকার।
মুরগির খামার করার কথা নিশ্চিত করে হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতাকর্মী পলি খাতুন বলেন, দেড় বছর আগে থেকে ‘এক স্যারের’ নির্দেশে তিনি কোয়ার্টারে বিনা খরচে বাস করছেন। প্রায় দেড় লাখ টাকা খরচ করে ভবনের মেরামত করেছেন। ভবনের ছাদে বর্তমানে ১০০টি সোনালি ও ৮০টি ব্রয়লার মুরগি পালন করছেন। এগুলোর বয়স প্রায় ২১ দিন। ৩০-৩৫ দিন বয়স হলে বিক্রি করা যাবে।
কুষ্টিয়া কুমারখালী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাক্তার মোছা. শারমিন আক্তার বলেন, হাসপাতালের কোয়ার্টার একসময় মাদকাসক্তদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছিল। প্রায়ই চুরির ঘটনা ঘটত। সেজন্য আগের স্যারেরা পলি খাতুনকে ভবনটি দেখাশোনার জন্য ব্যবহার করতে দিয়েছিলেন। তবে সেখানে মুরগি পালন করার কথা নয়। বিষয়টি আজই (রোববার) জেনেছেন। তাঁকে মুরগি সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে কুষ্টিয়ার সিভিল সার্জন ডা. শেখ মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন হাসান বলেন, বিষয়টি আমার নজরে এসেছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হবে।