• মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬, ০৪:১৯ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম:
মেসির ১৭তম বিশ্বকাপ গোলে এগিয়ে গেল আর্জেন্টিনা দৌলতপুর উপজেলা তাঁতী দ’লে’র জরুরী স’ভা কুষ্টিয়া সদর আসনের এমপি আমির হামজাকে জি’জ্ঞা’সা’বাদ করতে দুদকে যুবদল নে’তা’র আ’বে’দন সে’না’বা’হি’নী’কে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষ’ম’তা দিল স’রকার বাগেরহাটের রামপালে প্রতিমন্ত্রীর নি’র্দে’শে খালের বাঁ’ধ অ’প’সারণ  সাব-রেজিস্ট্রারের অফিস ‘ঘু”ষে’ সংশোধন হয় জমি রেজিস্ট্রির নামের ভু’ল কুষ্টিয়া অঞ্চলে ইপিজেড ও ইকোনোমিক জোন প্রতিষ্ঠা ও অর্থনৈতিক প্রভাব: কলামিস্ট মুহাম্মদ রাশেদ খান  কুষ্টিয়ায় ছা’ত্রলী’গ-যু’ব’লী’গে’র ঝ’টি’কা মি’ছি’ল, বিকেলে ছাত্রদল-যু’ব’দ’লের হুঁ’শি’য়ারি নারায়ণগঞ্জের এমপির ছেলে যুবদল নে”তা সজীব পুলিশের হা’তে আ’ট’ক হামের উ’পসর্গে আরও ৩ জনের মৃ”ত্যু, মোট প্রা’ণ’হা’নি ৬৮০

কুষ্টিয়া অঞ্চলে ইপিজেড ও ইকোনোমিক জোন প্রতিষ্ঠা ও অর্থনৈতিক প্রভাব: কলামিস্ট মুহাম্মদ রাশেদ খান 

notuntimes / ৪৩ Time View
Update : সোমবার, ২২ জুন, ২০২৬

কুষ্টিয়া অঞ্চলে ইপিজেড ও ইকোনোমিক জোন প্রতিষ্ঠা ও অর্থনৈতিক প্রভাব

ভূমিকা:

এবং ইপিজেড (EPZ) প্রতিষ্ঠা কেবল এই জেলার মানচিত্রেই নয়, বরং সমগ্র দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করতে যাচ্ছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে কুষ্টিয়া ঐতিহাসিকভাবেই ব্যবসা-বাণিজ্যের একটি অন্যতম কেন্দ্র, যা ভারত সীমান্তবর্তী এবং দেশের প্রধান প্রধান শহরের সাথে সড়ক ও রেলপথ দ্বারা যুক্ত। ভেড়ামারায় এই বৃহৎ শিল্পাঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ দেশের সুষম অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং শিল্প বিকেন্দ্রীকরণের এক অনন্য মাইলফলক। এটি একদিকে যেমন বিশাল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকা রাখবে, অন্যদিকে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করে কুষ্টিয়াকে একটি আধুনিক শিল্প নগরী হিসেবে রূপান্তর করবে।

কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় প্রস্তাবিত ইকোনমিক জোন ও ইপিজেড (যা প্রায় ৭,০০০ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন) ওই অঞ্চলে একটি বিশাল অর্থনৈতিক রূপান্তর ঘটাতে পারে। এটি অটোমোবাইল, তৈরি পোশাক এবং চামড়াসহ বিভিন্ন শিল্পে প্রচুর দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ টানবে। এর মাধ্যমে সামগ্রিক অঞ্চলে যে ধরনের অর্থনৈতিক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হতে পারে, তা নিচে আলোচনা করা হলো:

কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বেকারত্ব হ্রাস:

স্থানীয় বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর জন্য লাখ লাখ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

বিনিয়োগ ও রপ্তানি বৃদ্ধি:

সরকারি উদ্যোগে স্থাপিত এই অঞ্চলগুলো কর অবকাশ (Tax holiday) ও ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের মতো সুযোগ-সুবিধা প্রদান করায় ব্যাপক বৈদেশিক বিনিয়োগ (FDI) আসবে, যা দেশের রপ্তানি আয় বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখবে।

কৃষি ও স্থানীয় শিল্পের বিকাশ:

চামড়া, এগ্রো-প্রসেসিং, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং এবং পোশাক শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহের চেইনে যুক্ত হয়ে স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলো (SME) লাভবান হবে।

পরিকাঠামোর ব্যাপক উন্নয়ন:

এই মেগা প্রকল্পের কল্যাণে যোগাযোগ ব্যবস্থা (সড়ক, রেলপথ), বিদ্যুৎ, গ্যাস সরবরাহ এবং টেলিযোগাযোগ খাতের আধুনিকায়ন ঘটবে।

আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাস:

ঢাকাকেন্দ্রিক শিল্পায়নের চাপ কমিয়ে এবং পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক ভারসাম্য আনতে এটি কুষ্টিয়া ও এর আশেপাশের জেলাগুলোকে (যেমন- ঝিনাইদহ, মেহেরপুর) একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক হাব বা কেন্দ্রে পরিণত হবে।

শিল্প খাতের পরিবর্তন:

কুষ্টিয়া অঞ্চলে ইপিজেড এবং ইকোনমিক জোন প্রতিষ্ঠা হলে স্থানীয় ও জাতীয় শিল্প খাতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। এই পরিবর্তনের প্রধান দিকগুলো নিচে দেওয়া হলো:

বহুমাত্রিক শিল্পের বিকাশ:

ঐতিহ্যবাহী চাল বা কাপড়ের মিলের বাইরে গিয়ে অটোমোবাইল, আইসিটি, চামড়া এবং ভারী প্রকৌশল শিল্প গড়ে উঠবে।

তৈরি পোশাক খাতের সম্প্রসারণ:

গ্যাস ও বিদ্যুতের সহজলভ্যতার কারণে আধুনিক গার্মেন্টস এবং টেক্সটাইল মিল স্থাপিত হবে।

কৃষি-ভিত্তিক শিল্পায়ন:

স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ফল ও ফসলের ওপর ভিত্তি করে বড় আকারের ফুড প্রসেসিং বা খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে উঠবে।

সহায়ক শিল্পের (Backward Linkage) প্রসার:

মূল কারখানাগুলোকে কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশ সরবরাহের জন্য শত শত ক্ষুদ্র ও মাঝারি (SME) সহায়ক শিল্প তৈরি হবে।

প্রযুক্তির আধুনিকায়ন:

দেশি-বিদেশি যৌথ বিনিয়োগের ফলে স্থানীয় শিল্পে আধুনিক প্রযুক্তি ও স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতির ব্যবহার বৃদ্ধি পাবে।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশবান্ধব শিল্প:

কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (CETP) থাকার কারণে এই অঞ্চলের শিল্পায়ন হবে পরিকল্পিত এবং পরিবেশবান্ধব।

ভৌগোলিক ও কৌশলগত গুরুত্ব:

কুষ্টিয়া অঞ্চলে ইপিজেড এবং ইকোনমিক জোন স্থাপনের পেছনে এই অঞ্চলের ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থান সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। এই অঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্বের মূল দিকগুলো নিচে দেওয়া হলো:

যোগাযোগের প্রবেশদ্বার:

কুষ্টিয়া মূলত উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সংযোগস্থল, যা রাজধানী ঢাকা এবং মোংলা সমুদ্রবন্দরের সাথে সড়ক ও রেলপথে সরাসরি যুক্ত।

পদ্মা সেতু ও রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রের সুবিধা:

পদ্মা সেতুর মাধ্যমে ঢাকার সাথে দ্রুত যোগাযোগ এবং নিকটবর্তী রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়ার সুবিধা এই অঞ্চলকে শিল্পের জন্য আদর্শ করে তুলেছে।

ভারতের সাথে সীমান্ত ও বাণিজ্য সুবিধা:

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তবর্তী হওয়ায় এবং কুষ্টিয়ার দর্শনা ও বেনাপোল স্থলবন্দরের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে কাঁচামাল আমদানি ও পণ্য রপ্তানি অত্যন্ত সহজ হবে।

ভেড়ামারা গ্রিড ও জ্বালানি সংযোগ:

ভেড়ামারায় দেশের অন্যতম বৃহৎ বিদ্যুৎ গ্রিড উপকেন্দ্র এবং গ্যাস পাইপলাইনের সংযোগ থাকায় এখানে ভারী শিল্প স্থাপন ও পরিচালনা করা কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক।

আঞ্চলিক অর্থনৈতিক হাব:

এই জোনের মাধ্যমে কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, ঝিনাইদহ ও পাবনা জেলাকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত শিল্প ও বাণিজ্যিক অঞ্চল (Industrial Belt) গড়ে উঠবে।

“কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রভাব”:

কুষ্টিয়া অঞ্চলে ইপিজেড এবং ইকোনমিক জোন প্রতিষ্ঠা হলে স্থানীয় ও জাতীয় অর্থনীতি এবং কর্মসংস্থানে ব্যাপক ও বহুমুখী ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। এই পরিবর্তনের মূল দিকগুলো নিচে দেওয়া হলো:

লাখ লাখ মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থান:

নতুন নতুন কলকারখানা স্থাপনের ফলে স্থানীয় ও আশেপাশের জেলাগুলোর শিক্ষিত, অর্ধ-শিক্ষিত ও অদক্ষ শ্রমজীবী মানুষের জন্য বিশাল কর্মযজ্ঞ তৈরি হবে।

নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন:

পোশাক শিল্প এবং হালকা প্রকৌশল কারখানায় বিপুল সংখ্যক নারী কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবেন, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াবে।

পরোক্ষ আয়ের সুযোগ বৃদ্ধি:

শিল্পাঞ্চলকে কেন্দ্র করে আবাসন, পরিবহন, হোটেল-রেস্তোরাঁ, ব্যাংকিং এবং লজিস্টিক খাতে হাজার হাজার মানুষের পরোক্ষ আয়ের পথ সুগম হবে।

জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন:

মানুষের নিয়মিত আয় বাড়ার ফলে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পাবে, যা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামগ্রিক জীবনযাত্রার মান উন্নত করবে।

রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয়:

স্থানীয়ভাবে পণ্য উৎপাদিত ও রপ্তানি হওয়ার কারণে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হবে এবং আমদানি নির্ভরতা কমবে।

দারিদ্র্য বিমোচন ও আঞ্চলিক বৈষম্য দূরীকরণ:

এই শিল্পায়ন কুষ্টিয়া ও এর আশেপাশের অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য বদলে দেবে এবং রাজধানী-কেন্দ্রিক কর্মসংস্থানের চাপ কমিয়ে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করবে।

“চ্যালেঞ্জ ও করণীয়”:

কুষ্টিয়া অঞ্চলে ইপিজেড এবং ইকোনমিক জোনের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে কিছু বাস্তবসম্মত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা এবং সুনির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। এর প্রধান দিকগুলো নিচে দেওয়া হলো:

মূল চ্যালেঞ্জসমূহ:

ভূমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ:

স্থানীয় কৃষিজমি অধিগ্রহণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকদের সঠিক সময়ে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা।

দক্ষ জনবলের অভাব:

আধুনিক ও প্রযুক্তিভিত্তিক শিল্প কারখানার জন্য স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মাঝে প্রয়োজনীয় কারিগরি দক্ষতার ঘাটতি।

জালানি ও ইউটিলিটি সরবরাহ:

কলকারখানা চালু হওয়ার পর নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, গ্যাস এবং পানির সংযোগ দীর্ঘমেয়াদে বজায় রাখা।

পরিবেশ বিপর্যয়:

শিল্প বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা না হলে স্থানীয় জলাশয় (যেমন- পদ্মা ও গড়াই নদী) এবং ফসলি জমি দূষিত হওয়ার ঝুঁকি।

করণীয় পদক্ষেপসমূহ:

কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন:

স্থানীয় তরুণদের শিল্প-উপযোগী করতে কুষ্টিয়ায় পর্যাপ্ত ভোকেশনাল ও আইটি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট গড়ে তোলা।

ওয়ান-স্টপ সার্ভিস কার্যকর করা:

আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দ্রুত লাইসেন্স ও অনুমোদন দেওয়ার ব্যবস্থা করা।

যুগোপযোগী বর্জ্য ব্যবস্থাপনা:

প্রতিটি কারখানায় ইটিপি (Effluent Treatment Plant) বাধ্যতামূলক করা এবং পরিবেশ আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা।

সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণ:

শিল্পাঞ্চলের পণ্য আনা-নেওয়ার জন্য স্থানীয় সংযোগ সড়কগুলোর প্রশস্তকরণ এবং রেল ও নৌ-রুট উন্নত করা।

“কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন”:

কুষ্টিয়া অঞ্চলে ইপিজেড এবং ইকোনমিক জোন প্রতিষ্ঠা স্থানীয় মানুষের জীবনমান সম্পূর্ণ বদলে দেবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের মূল দিকগুলো নিচে দেওয়া হলো:

ব্যাপক বেকারত্ব হ্রাস:

স্থানীয় শিক্ষিত ও সাধারণ জনগোষ্ঠীর জন্য কয়েক লাখ সরাসরি কর্মসংস্থান তৈরি হবে, যা এই অঞ্চলের বেকারত্ব সমস্যার স্থায়ী সমাধান করবে।

নারীর ক্ষমতায়ন:

বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও হালকা প্রকৌশল শিল্পে বিপুল সংখ্যক নারী কর্মী নিয়োগের ফলে নারীদের আর্থিক স্বাবলম্বিতা বৃদ্ধি পাবে।

আয় বৃদ্ধি ও দারিদ্র্য বিমোচন:

মানুষের নিয়মিত এবং নিশ্চিত আয়ের সুযোগ তৈরি হওয়ায় পারিবারিক সঞ্চয় বাড়বে এবং গ্রামীণ দারিদ্র্যের হার দ্রুত হ্রাস পাবে।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের আধুনিকায়ন:

মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির সাথে সাথে এই অঞ্চলে মানসম্মত বেসরকারি স্কুল, কলেজ এবং আধুনিক চিকিৎসাকেন্দ্র বা হাসপাতাল গড়ে উঠবে।

আবাসন ও বাণিজ্যিক প্রসার:

শিল্পাঞ্চলকে কেন্দ্র করে আধুনিক আবাসন, বহুতল ভবন, শপিং মল এবং উন্নত বাজার ব্যবস্থা গড়ে উঠবে, যা জীবনযাত্রায় শহুরে ছোঁয়া আনবে।

পরোক্ষ জীবিকার সুযোগ:

হাজার হাজার মানুষের যাতায়াত ও বসবাসের কারণে পরিবহন, রেস্তোরাঁ ও দৈনন্দিন মুদি ব্যবসার মতো পরোক্ষ আয়ের খাতগুলো ব্যাপক চাঙ্গা হবে।

“অবকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন”:

কুষ্টিয়া অঞ্চলে ইপিজেড এবং ইকোনমিক জোনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় ও আঞ্চলিক অবকাঠামো এবং যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। এই খাতের প্রধান উন্নয়নগুলো নিচে দেওয়া হলো:

সড়ক ও মহাসড়কের আধুনিকায়ন:

শিল্পাঞ্চলের ভারী যানবাহন চলাচলের সুবিধার্থে কুষ্টিয়া ও এর আশেপাশের সংযোগ সড়ক এবং মহাসড়কগুলোকে ৪ বা ৬ লেনে উন্নীত করা হবে।

রেল যোগাযোগের সম্প্রসারণ:

কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা ও পোড়াদহ রেল জংশনের আধুনিকায়ন ঘটবে এবং শিল্পাঞ্চলের পণ্য সহজে আনা-নেওয়ার জন্য বিশেষ কন্টেইনার টার্মিনাল ও ডেডিকেটেড রেললাইন স্থাপিত হবে।

মোংলা ও বেনাপোলের সাথে সরাসরি সংযোগ:

পদ্মা সেতু ব্যবহারের মাধ্যমে মোংলা সমুদ্রবন্দর এবং বেনাপোল স্থলবন্দরের সাথে কুষ্টিয়ার যাতায়াত সময় অনেক কমে আসবে, যা পণ্য পরিবহন খরচ সাশ্রয় করবে।

নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস গ্রিড:

নিকটবর্তী রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও ভেড়ামারা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে সরাসরি শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ এবং বিশেষ গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত হবে।

স্মার্ট আইসিটি ও টেলিকম নেটওয়ার্ক:

উচ্চগতির ফাইবার অপটিক ইন্টারনেট ও আধুনিক টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে, যা এই অঞ্চলকে একটি ডিজিটাল শিল্প নগরীতে রূপান্তর করবে।

নাগরিক অবকাঠামোর বিকাশ:

কলকারখানার কর্মকর্তা ও শ্রমিকদের জন্য আধুনিক পরিকল্পিত আবাসন, উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, বর্জ্য শোধনাগার (CETP) এবং বিনোদন পার্ক তৈরি হবে।

নির্দিষ্ট বিনিয়োগ সুবিধা:

কুষ্টিয়া অঞ্চলে প্রস্তাবিত ইপিজেড এবং ইকোনমিক জোনে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে সরকার সুনির্দিষ্ট এবং অত্যন্ত আকর্ষণীয় কিছু বিনিয়োগ সুবিধা (Investment Incentives) প্রদান করছে। এই বিশেষ সুবিধাগুলোর মূল দিকগুলো নিচে দেওয়া হলো:

দীর্ঘমেয়াদি কর অবকাশ (Tax Holiday):

শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালুর প্রথম কয়েক বছর ১০০% পর্যন্ত আয়কর রেয়াত পাওয়া যাবে এবং পরবর্তী বছরগুলোতে ক্রমান্বয়ে হ্রাসকৃত হারে এই সুবিধা কার্যকর থাকবে।

শুল্কমুক্ত আমদানি সুবিধা:

কারখানার প্রয়োজনীয় মূলধনী যন্ত্রপাতি (Capital Machinery), নির্মাণ সামগ্রী এবং পণ্য তৈরির কাঁচামাল সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি করা যাবে।

রপ্তানি আয়ে কর রেয়াত:

এই জোনগুলো থেকে উৎপাদিত পণ্য বিদেশে রপ্তানি করার ক্ষেত্রে অর্জিত আয়ের ওপর কোনো কর বা ডিউটি দিতে হবে না।

সহজ মুনাফা প্রত্যাহার (Profit Repatriation):

বিদেশি বিনিয়োগকারীরা তাদের অর্জিত লভ্যাংশ, রয়্যালটি এবং মূলধন কোনো জটিলতা ছাড়াই শতভাগ নিজ দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন।

ওয়ান-স্টপ সার্ভিস (OSS):

বিনিয়োগকারীদের ট্রেড লাইসেন্স, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ, পরিবেশ ছাড়পত্র এবং ভিসা প্রক্রিয়াকরণের মতো সব সরকারি সেবা একটি মাত্র জানালা বা প্ল্যাটফর্ম থেকে দ্রুত দেওয়া হবে।

শতভাগ বিদেশি মালিকানার সুযোগ:

ইকোনমিক জোনে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সম্পূর্ণ নিজস্ব মালিকানায় (১০০% Foreign Equity) ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবেন।

ভ্যাট ও ডিউটি অব্যাহতি:

স্থানীয় বাজার থেকে কাঁচামাল কেনা, বিদ্যুৎ-গ্যাস ব্যবহার এবং স্থানীয়ভাবে পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট হারে ভ্যাট ও আবগারি শুল্ক ছাড় পাওয়া যাবে।

কৃষিভিত্তিক শিল্পের সম্ভাবনা ও সম্প্রসারণ:

কুষ্টিয়া অঞ্চলে ইপিজেড ও ইকোনমিক জোন প্রতিষ্ঠা হলে স্থানীয় ও আঞ্চলিক কৃষিখাত এক নতুন যুগে প্রবেশ করবে। কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা ও ঝিনাইদহ জেলা কৃষি উৎপাদনে অত্যন্ত সমৃদ্ধ হওয়ায় এখানে কৃষিভিত্তিক শিল্প বা এগ্রো-প্রসেসিং শিল্পের সম্ভাবনা ও সম্প্রসারণের মূল দিকগুলো নিচে দেওয়া হলো:

আধুনিক ফুড প্রসেসিং প্ল্যান্ট:

স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত আম, লিচু, কলা ও পেঁপে থেকে জুস, জ্যাম, জেলি এবং ক্যানড ফ্রুটস তৈরির বড় বড় কারখানা গড়ে উঠবে।

ধান ও চাল শিল্পের আধুনিকায়ন:

কুষ্টিয়ার ঐতিহ্যবাহী খাজানগরের চাল শিল্পকে আরও আধুনিক করে চালের কুঁড়া থেকে তেল (Rice Bran Oil) এবং সুগন্ধি চাল রপ্তানির বড় বড় অটোমেটিক রাইস মিল স্থাপিত হবে।

সবজি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও কোল্ড চেইন:

এই অঞ্চলে প্রচুর শাকসবজি ও আলু উৎপাদিত হয়; এগুলোকে প্রক্রিয়াজাত করে বিদেশে রপ্তানি (যেমন- পটেটো চিপস, ফ্রোজেন সবজি) এবং দীর্ঘকাল সংরক্ষণের জন্য আধুনিক হিমাগার চেইন তৈরি হবে।

তামাক চাষের বিকল্প শিল্প:

কুষ্টিয়ার বিশাল একটি অংশে তামাক চাষ হয়; ইকোনমিক জোন সৃষ্টি হলে কৃষকরা তামাক ছেড়ে উচ্চমূল্যের বাণিজ্যিক ফসল ও ঔষধি উদ্ভিদ চাষে উৎসাহিত হবে, যা এগ্রো-ফার্মাসিউটিক্যালস শিল্পের কাঁচামাল জোগাবে।

ডেইরি, পোল্ট্রি ও ফিড মিল সম্প্রসারণ:

মাংস, দুধ ও ডিম প্রক্রিয়াজাতকরণের পাশাপাশি উন্নত মানের গবাদি পশু ও মাছের খাদ্য (Feed Mill) তৈরির নতুন কারখানা স্থাপিত হবে।

চামড়া শিল্পের বিকাশ:

স্থানীয় বিপুল গবাদি পশুর চামড়াকে প্রক্রিয়াজাত করতে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব ট্যানারি এবং চামড়াজাত পণ্য (জুতো, ব্যাগ) তৈরির কারখানা গড়ে উঠবে।

কৃষকদের ন্যায্য মূল্য ও চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদ:

বড় বড় কোম্পানি সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে কাঁচামাল কিনবে (Contract Farming), ফলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমবে এবং কৃষকরা ফসলের সঠিক মূল্য পাবেন।

উপসংহার:

পরিশেষে বলা যায়, কুষ্টিয়া অঞ্চলে ইপিজেড এবং ইকোনমিক জোন প্রতিষ্ঠা কেবল কিছু শিল্প কারখানার সমাবেশ নয়, বরং এটি এই অঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামো পরিবর্তনের এক মহাপরিকল্পনা। ভৌগোলিক ও কৌশলগত সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে পরিকল্পিত অবকাঠামো উন্নয়ন, কৃষিভিত্তিক শিল্পের আধুনিকায়ন এবং আকর্ষণীয় বিনিয়োগ সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে কুষ্টিয়া অচিরেই দেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক হাবে পরিণত হবে। পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয় তরুণদের কারিগরি দক্ষতা উন্নয়নের চ্যালেঞ্জগুলো যদি সঠিকভাবে মোকাবেলা করা যায়, তবে এই মেগা প্রকল্প কুষ্টিয়াসহ সমগ্র দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বেকারত্ব দূর করে মানুষের জীবনযাত্রার মানকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে। লালন ও রবীন্দ্র স্মৃতিবিজড়িত সাংস্কৃতিক রাজধানী কুষ্টিয়া আগামী দিনে বাংলাদেশের টেকসই শিল্পায়নেরও এক রোল মডেল হয়ে উঠবে—এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

কুষ্টিয়া অঞ্চলে প্রস্তাবিত ইপিজেড ও ইকোনমিক জোন প্রতিষ্ঠা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনে কর্মসংস্থান ও শিল্প বিকেন্দ্রীকরণে ভূমিকা রাখবে। ভৌগোলিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে এই মেগা প্রকল্পটি এগ্রো-প্রসেসিং, ভারী শিল্প এবং আধুনিক অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে কুষ্টিয়াকে অন্যতম প্রধান শিল্প নগরী হিসেবে গড়ে তুলবে।

লেখক 

মুহাম্মদ রাশেদ খান 

সহযোগী সম্পাদক 

মাসিক ইতিহাস অন্বেষা 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!