জাতিসংঘের বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন মহাসচিব নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ পদে এবার আটজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইলসহ বিভিন্ন পক্ষের সমালোচনা ও চাপের মধ্যে জাতিসংঘের পরবর্তী নেতৃত্ব নির্ধারণের এই প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। জাতিসংঘ মহাসচিবের পদকে বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন কূটনৈতিক দায়িত্বগুলোর একটি হিসেবে দেখা হয়। মহাসচিবের হাতে সরাসরি কোনো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বা সামরিক শক্তি নেই। তবু বিশ্বের সংঘাত, যুদ্ধ, মানবিক সংকট, শান্তিরক্ষা ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।এবারের নির্বাচনে আটজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। গায়ানার ক্যারোলিন রড্রিগেজ- বার্কেট প্রতিযোগিতায় এগিয়ে এসেছেন। এছাড়া আরো নারী প্রার্থীগণ হলেন: কোস্টারিকার রেবেকা গ্রিনস্প্যান, চিলির মিশেল ব্যাশেলেট, ইকুয়েডরের মারিয়া ফার্নান্দা এস্পিনোসা, ইকুয়েডরের ইভোন বাকী। পুরুষ প্রার্থী তিনজন হচ্ছেনÑআর্জেন্টিনার রাফায়েল গ্রোসি, সেনেগালের মাকি সাল এবং উগান্ডার ওলারা ওতুনু।
তবে এই নির্বাচন সরাসরি ভোটে হয় না। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সুপারিশের পর সাধারণ পরিষদ মহাসচিবকে নিয়োগ দেয়। ফলে প্রার্থীদের যোগ্যতার পাশাপাশি নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের রাজনৈতিক সমর্থনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জাতিসংঘের মহাসচিব নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপত্তা পরিষদের এই পাঁচ স্থায়ী সদস্যের যেকোনো একটি দেশের বিরোধিতা কোনো প্রার্থীর নির্বাচনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। ফলে প্রার্থীদের জন্য কূটনৈতিক সমঝোতা ও গ্রহণযোগ্যতা অর্জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিও এবারের নির্বাচনকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজা ও ফিলিস্তিন সংকট, ইরান যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং জাতিসংঘের কার্যকারিতা নিয়ে বিতর্ক—সব মিলিয়ে নতুন মহাসচিবকে অত্যন্ত জটিল আন্তর্জাতিক পরিবেশ মোকাবিলা করতে হবে।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে জাতিসংঘের সম্পর্ক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরো উত্তেজনাপূর্ণ হয়েছে। ফলে নতুন মহাসচিবকে একদিকে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলা করতে হবে, অন্যদিকে জাতিসংঘের সনদ, আন্তর্জাতিক আইন ও বহুপক্ষীয় কূটনীতির বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখতে হবে।প্রতিযোগিতায় আঞ্চলিক ভারসাম্যও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। জাতিসংঘের মহাসচিব ঐতিহ্যগতভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রতিনিধিত্বের ভারসাম্যের বিষয়টি বিবেচনা করে নির্বাচিত হয়ে থাকেন। তাই প্রার্থীর ব্যক্তিগত যোগ্যতার পাশাপাশি তিনি কোন অঞ্চল থেকে এসেছেন এবং বিভিন্ন শক্তির কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা কতটা—সেটিও নির্বাচনি হিসাবের অংশ।
পরবর্তী মহাসচিব শুধু জাতিসংঘের প্রশাসনিক প্রধান হবেন না; তাকে এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিতে হবে, যখন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গভীর বিভাজনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধ ও সংঘাত কমানো, পরাশক্তিগুলোর মধ্যে সংলাপের পথ খোলা রাখা এবং জাতিসংঘের প্রতি বিশ্বের আস্থা পুনর্গঠন হবে নতুন মহাসচিবের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।