কালীগঞ্জের সেই বিতর্কিত ওসি জেল্লালকে প্রত্যাহার
অবশেষে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ থানার সমালোচিত ও বিতর্কিত ওসি জেল্লাল হোসেনকে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে। শনিবার (৮ আগস্ট) রাত ১০টার দিকে ঝিনাইদহ পুলিশ সুপার মিয়া মোহাম্মদ আশিস বিন হাছান স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে এ তথ্য জানানো হয়।অফিস আদেশে বলা হয়েছে, কালীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জেল্লাল হোসেনকে ঝিনাইদহ পুলিশ লাইন্সে ওআর (অফিস রিজার্ভ), ঝিনাইদহ পুলিশ লাইনের ওআর কবির হোসেনকে কালীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ ও ঝিনাইদহ সদর সার্কেলে সংযুক্ত মো. জুলফিকার আলীকে হরিণাকুণ্ডু থানার অফিসার ইনচার্জ হিসেবে বদলি করা হলো। এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে আদেশে উল্লেখ করা হয়।পুলিশের একটি সূত্র বলছে, সাধারণত কোনো থানা থেকে ওসি প্রত্যাহার (ক্লোজড) করা হলে নতুন পোস্টিং বা পদায়নের আগ পর্যন্ত সাময়িক সময়ের জন্য এবং প্রশাসনিক বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে কর্মকর্তাদের এই ওআর (অফিস রিজার্ভ) এ সংযুক্ত করা হয়।জানা গেছে, গত ১৭ জুলাই কালীগঞ্জ থানায় ওসি জেল্লাল হোসেনের সামনে দৈনিক যুগান্তর ও দীপ্ত টেলিভিশনের প্রতিনিধি শাহরিয়ার আলম সোহাগ ও নাগরিক টিভির মিশন আলীর ওপর হামলা চালায় চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা। এ সময় ওসি জেল্লাল হোসেনের সঙ্গে হামলাকারীদের সখ্য থাকায় তাদের নিরাপদে স্থান ত্যাগ করান তিনি। এ ঘটনায় এজাহার দেওয়ার ১০ ঘণ্টা পর মামলা রেকর্ড করেন তিনি। হামলাকারীদের সঙ্গে থানায় সালিশ বসিয়ে বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে ওসি জেল্লাল হোসেনের বিরুদ্ধে।এ ছাড়া গত ১১ জুন কালীগঞ্জ উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা এলাকা থেকে নাজমুল হোসেন নামে একজনকে আটক করা হয়। এ সময় সেখান থেকে ২ পিস ইয়াবা পেলেও তাকে ১০ পিস ইয়াবা দিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। সে সময় টেবিলের ওপর থাকা দুটি স্মার্টফোন গায়েব করার চেষ্টা করেন ওসি। এ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ১৫ জুলাই প্রতিবেদন প্রকাশ পেলে পরদিন ভুক্তভোগীকে দুটি ফোনই ফেরত দেওয়া হয়। এ নিয়ে বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে পুলিশ।
এদিকে গত ২৩ জুন ঝিনাইদহ জেলা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের শ্রমবিষয়ক সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান বিজুকে পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় প্রথমে মোস্তাফিজুর রহমান বিজুকে ১নং আসামি করা হয়েছে বলে গণমাধ্যমকর্মীদের জানান ওসি জেল্লাল হোসেন। পরে তাকে ৯নং আসামি দেখিয়ে মামলা রেকর্ড করা হয়।এদিকে শহরে আড়পাড়া এলাকার মাদক ব্যবসায়ী রুপালি খাতুনের কাছ থেকে মাসিক ৬০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ ছিল ওসি জেল্লাল হোসেনের বিরুদ্ধে। এ ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয়। ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর কালীগঞ্জ থানায় যোগদানের পর পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযান একদমই কমে যায়। পুলিশের নিষ্ক্রিয়তায় উপজেলায় মাদক বেচাকেনা বেড়ে যাওয়ার প্রতিবাদে সম্প্রতি পাড়া-মহল্লায় অভিযানে নামে এলাকাবাসী। এ ছাড়াও গত কয়েক মাসে উপজেলাজুড়ে চুরি-ডাকাতিসহ আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি হয়। চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও তাদের আটক না করার অভিযোগ রয়েছে ওসি জেল্লাল হোসেনের বিরুদ্ধে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কালীগঞ্জ থানায় যোগদানের আগে তিনি যশোরের চৌগাছা থানায় ওসি (তদন্ত) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেখানে তিনি এক যুবলীগের নেতার সঙ্গে সখ্যতা গড়ে সালিশ বাণিজ্য করতেন। ওই থানায় দায়িত্ব পালনকালে ২০২৪ সালের ১০ জানুয়ারি মাথার ওপর নৌকা প্রতীক বসানো একটা কাঠের চেয়ারে বসে থাকা ছবি নিজের ফেসবুকে পোস্ট করেন।স্থানীয় সংবাদকর্মী মিশন আলী বলেন, ওসির সামনে তার পেটুয়া বাহিনী সাংবাদিকদের ওপর হামলা করে আর ওসি তাদের নিরাপদে স্থান ত্যাগ করিয়ে দেয়। এই ওসির বিরুদ্ধে আসামির ফোন গায়েব, মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মাসিক টাকা নেওয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে।
বদলির বিষয়ে ঝিনাইদহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) শেখ বিল্লাল হোসেন বলেন, হরিণাকুণ্ডুতে ওসি ছিল না। সেখানে মো. জুলফিকার আলীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কালীগঞ্জের ওসি জেল্লাল হোসেনকে পুলিশ লাইন্সে ওআর আর কবির হোসেনকে কালীগঞ্জ থানার ওসি হিসেবে বদলি করা হয়েছে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা নিয়মিত পোস্টিং।