দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জেলা কুষ্টিয়ায় বালিবাহী ড্রাম ট্রাকের বেপরোয়া চলাচলে সড়ক নিরাপত্তা পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। শহর ও গ্রামাঞ্চলের ব্যস্ত সড়কে অতিরিক্ত গতি, ওভারলোডিং এবং নিরাপত্তা বিধি অমান্যের অভিযোগে বাড়ছে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির সংখ্যা। স্থানীয়দের দাবি, কার্যকর ও ধারাবাহিক নজরদারির অভাবে সড়কগুলো দিন দিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
জেলার মিরপুর, ভেড়ামারা, দৌলতপুর, কুমারখালী ও খোকসা উপজেলায় গত কয়েক মাসে ড্রাম ট্রাকের ধাক্কায় একাধিক মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেছে। নিহত ও আহতের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য থাকলেও স্থানীয় সূত্র বলছে, অধিকাংশ দুর্ঘটনাই দিনের বেলায়—যখন স্কুলগামী শিশু, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের চলাচল সর্বাধিক।
শহরের এক বাসিন্দা সম্রাট বলেন, “দিনের বেলায় এসব ট্রাক এমন গতিতে চলে, মনে হয় রাস্তায় রেস চলছে। মোটরসাইকেল বা রিকশা সামনে পড়লে বাঁচার উপায় থাকে না।”
অনেক ড্রাম ট্রাকে দৃশ্যমান নম্বর প্লেট নেই। কিছু ক্ষেত্রে অপ্রাপ্তবয়স্ক চালক দিয়ে ট্রাক চালানোর অভিযোগও রয়েছে। নির্ধারিত লোডসীমা অমান্য করে বালু বহন এবং পাতলা পলিথিন বা কাপড় দিয়ে ঢেকে আনার ফলে সড়কে বালু ছড়িয়ে পড়ছে। এতে পিছনের যানবাহনের চালকদের চোখে-মুখে বালু ঢুকে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনেও উচ্চগতিতে ট্রাক চলাচল করায় অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। স্থানীয়দের মতে, প্রশাসনের মাঝে মাঝে পরিচালিত অভিযান দীর্ঘমেয়াদি সমাধান দিতে পারছে না।
কুষ্টিয়া পৌরসভার যুগিয়া বালুঘাট থেকে প্রতিদিন গড়ে ২০০ থেকে ২৫০টি ড্রাম ট্রাক বালু নিয়ে জেলার বিভিন্ন এলাকায় যাচ্ছে বলে স্থানীয়দের দাবি। এতে একদিকে সড়কের অবস্থা বেহাল হচ্ছে, অন্যদিকে আশপাশের এলাকায় ধুলোবালির কারণে জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
একাধিক বাসিন্দা জানান, ট্রাক চলাচলের সময় উড়ে আসা ধুলায় ঘরবাড়ি ভরে যায়। শিশুদের স্কুলে যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে, খাবার টেবিলেও ধুলো পড়ছে। এর আগে এলাকাবাসী মানববন্ধন করলেও কয়েকদিন বন্ধ থাকার পর পুনরায় ট্রাক চলাচল শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ।
সচেতন মহলের মতে, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ট্রাফিক পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন ও পরিবহন মালিকদের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা, স্পিড মনিটরিং, নম্বর প্লেট ও ফিটনেস যাচাই, লাইসেন্স পরীক্ষা এবং ওভারলোডিংয়ের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি বাস্তবায়ন জরুরি।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর ও কঠোর ব্যবস্থা না নিলে বালিবাহী ড্রাম ট্রাকের বেপরোয়া চলাচলে কুষ্টিয়ার সড়কে প্রাণহানির সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে প্রশাসনের দৃশ্যমান ও ধারাবাহিক পদক্ষেপই এখন সময়ের দাবি।
চৌড়হাঁস হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবু ওবায়েদ বলেন, “ড্রাম ট্রাকগুলোর লাইসেন্স রয়েছে, তবে অনেক ক্ষেত্রে নম্বর প্লেট ব্যবহার করা হয় না। আমরা তাদের নির্দেশনা দিচ্ছি যাতে নম্বর প্লেট লাগানো হয়। দিনের বেলায় অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। নিয়ম মেনে রাতের বেলায় চলাচল করলে ঝুঁকি কমতে পারে।”
তিনি আরও জানান, নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় অতিরিক্ত দায়িত্ব থাকায় নজরদারিতে কিছুটা ঘাটতি ছিল, তবে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে অভিযান জোরদার করা হবে।
কুষ্টিয়া ট্রাফিক বিভাগের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর কাজী হাসানুজ্জামান বলেন, “ড্রাম ট্রাক বৈধ হলেও সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টার মধ্যে শহরের ভেতরে প্রবেশের অনুমতি নেই। এ সময় প্রবেশ করলে আমরা ব্যবস্থা নিই। হাইওয়ে সড়ক হাইওয়ে পুলিশের আওতাধীন, আর পৌর এলাকা আমাদের নিয়ন্ত্রণে।”
‘নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)’ কুষ্টিয়া জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক শাহারিয়া ইমন রুবেল বলেন, “ড্রাম ট্রাকগুলো প্রায়ই ওভারলোডিং করে বালু বহন করছে এবং কার্যকরভাবে ঢেকে আনা হচ্ছে না। ফলে বালু সড়কে ছড়িয়ে পড়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।”
তিনি নির্ধারিত লোডসীমা নিশ্চিত করা, বালু পরিবহনের আগে পানি স্প্রে করে স্থির করা এবং মোটা ত্রিপল দিয়ে শক্তভাবে ঢেকে আনা বাধ্যতামূলক করার দাবি জানান। একই সঙ্গে নিয়ম না মানলে কঠোর শাস্তির আহ্বান জানান তিনি।