ক্যালেন্ডারে লাল দাগ দেখলেই অনেকের মুখে হাসি ফুটে ওঠে। কিন্তু সেই লাল দাগের সংখ্যা যদি গুনতে বসেন, বাংলাদেশ যে বিশ্বের বেশিরভাগ দেশের চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে— তা হয়ত অবাক করবে। নতুন এক বিশ্লেষণ বলছে, সরকারি ছুটির সংখ্যায় বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। আর বাংলাদেশের সামনে রয়েছে শুধু মিয়ানমার।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশে মোট ২৯টি জাতীয় সরকারি ছুটি রয়েছে। ৩০টি ছুটি নিয়ে তালিকার শীর্ষে মিয়ানমার। আর ২৫টি ছুটি নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে শ্রীলঙ্কা। অর্থাৎ ছুটির ক্যালেন্ডারে বাংলাদেশ বেশ ভালোভাবেই ‘ছুটির দৌড়ে’ এগিয়ে আছে।
পিউ রিসার্চ সেন্টার ১৯০টি জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রের সরকারি ছুটির তথ্য বিশ্লেষণ করেছে। এতে দেখা গেছে, বিশ্বজুড়ে জাতীয় সরকারি ছুটির মধ্যম সংখ্যা মাত্র ১৩টি। সেই হিসাবে বাংলাদেশের ২৯টি ছুটি বৈশ্বিক মধ্যম সংখ্যার দ্বিগুণেরও বেশি।
বাংলাদেশের ওপরে থাকা মিয়ানমারে রয়েছে ৩০টি সরকারি ছুটি। এরপর শ্রীলঙ্কায় ২৫টি। এ ছাড়া কম্বোডিয়া, ইরান ও লেবাননেও ২০টির বেশি সরকারি ছুটি রয়েছে।
বাংলাদেশে ছুটি বেশি হওয়ার কারণ কী?
বাংলাদেশে সরকারি ছুটির বড় একটি অংশই বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব ও গুরুত্বপূর্ণ দিবসকে ঘিরে। দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলিম হওয়ায় ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা উপলক্ষে একাধিক দিনের ছুটি থাকে। পাশাপাশি হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের গুরুত্বপূর্ণ উৎসব ও দিবসও সরকারি ছুটির তালিকায় রয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে জন্মাষ্টমী, বুদ্ধ পূর্ণিমা ও বড়দিনের মতো ধর্মীয় উৎসব। অর্থাৎ বাংলাদেশের ছুটির ক্যালেন্ডারে ধর্মীয় বৈচিত্র্যেরও বেশ ভালো একটা ছাপ রয়েছে।
শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাতেও সরকারি ছুটি রাখা হয়। ২০২৬ সালের ছুটির তালিকায় জাতীয় নির্বাচনের জন্যও দুটি সরকারি ছুটি ছিল। ফলে উৎসবের ছুটির সঙ্গে জাতীয় আয়োজনও যোগ হয়ে মোট ছুটির সংখ্যা আরও বেড়েছে।
শ্রীলঙ্কা ও মিয়ানমার— দুই দেশই বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ। বিশেষ করে শ্রীলঙ্কার সরকারি ছুটির ক্যালেন্ডারে চন্দ্রচক্রের সঙ্গে সম্পর্কিত বেশ কিছু ছুটি রয়েছে।
মিয়ানমারের ক্ষেত্রেও বৌদ্ধ ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি জাতিগত ও রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন দিবস সরকারি ছুটির তালিকায় জায়গা পেয়েছে।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের গবেষকদের মতে, যেসব দেশে মুসলিম বা বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেশি, সেসব দেশে সরকারি ছুটির সংখ্যাও তুলনামূলক বেশি হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়।
ছুটির দৌড়ে বাংলাদেশের বিপরীত প্রান্তে রয়েছে সুইজারল্যান্ড। দেশটি ফেডারেল পর্যায়ে মাত্র একটি জাতীয় সরকারি ছুটি স্বীকৃতি দেয়।
তবে এর অর্থ এই নয় যে সুইজারল্যান্ডের মানুষ সারাবছর ছুটিহীন। দেশটির বিভিন্ন ক্যান্টনে স্থানীয়ভাবে আরও বেশ কিছু ছুটি রয়েছে। এ তালিকায় বসনিয়া ও হার্জেগোভিনিয়ায় চারটি এবং উরুগুয়েতে পাঁচটি জাতীয় সরকারি ছুটি রয়েছে।
পিউ রিসার্চ সেন্টার সরকারি ছুটির তথ্য সংগ্রহ করেছে ‘টাইম অ্যান্ড ডেট’-এর বৈশ্বিক ক্যালেন্ডার ডেটাবেস থেকে। এরপর জাতীয় শ্রম আইন, সরকারি বিজ্ঞপ্তি ও আঞ্চলিক সংবাদ প্রতিবেদন ব্যবহার করে তথ্য যাচাই করা হয়েছে।
এই হিসাবে শুধু জাতীয়ভাবে স্বীকৃত এবং কর্মদিবস নয়— এমন সরকারি ছুটিগুলো ধরা হয়েছে। ঐচ্ছিক ছুটি, অর্ধদিবস এবং শুধু প্রদেশ, অঙ্গরাজ্য বা স্থানীয় পর্যায়ের ছুটি এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
বিশ্বের ১৯০টি দেশের তুলনায় বাংলাদেশের ২৯টি সরকারি ছুটি নিঃসন্দেহে বেশ বড় সংখ্যা। ধর্মীয় বৈচিত্র্য, জাতীয় দিবস ও বিশেষ রাষ্ট্রীয় আয়োজন— সব মিলিয়েই তৈরি হয়েছে এই দীর্ঘ ছুটির তালিকা।