• শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:২৮ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম:
সংসদের সাউন্ড সিস্টেমে অ’নি’য়’মে’র অ’ভি’যো’গ নিয়ে অ’নু’স’ন্ধান চ’লছে: দুদকের ডিজি ৩১ অক্টোবরের লং’মা’র্চ স’ফ’ল করতে কুষ্টিয়ায় ১১ দ’লী’য় ঐ’ক্যে’র প্র’স্তু’তি স’ভা অনুষ্ঠিত লালন আখড়ায় মা’দ’ক’বি’রো’ধী অ’ভি’যা’ন, জ’ব্দ ২ হাজার ক’ল’কে আন্তর্জাতিক সাদাছড়ি দি’ব’স আজ: কুষ্টিয়ায় সাড়ে ৮ হাজার দৃ’ষ্টিপ্র’তিব’ন্ধী হাসপাতালে নি’য়ো’গ বাবুর্চির সহকারী হি’সে’বে, দা’য়ি’ত্ব পা’ল’ন করছেন ওয়ার্ড ব’য়ে’র ইউপি নির্বাচন শুরু ২১ জানুয়ারি, পাঁচ ধা’পে শে’ষ বিজিবির ও’প’র চো’রা’কার’বা’রি’দে’র হা’ম’লা, গু”লি”তে নি”হ”ত ১ বালুমহাল, চালুর চে’ষ্টা’কে ঘিরে অ’স্ত্রে’র ম’হ’ড়া ও গু’লি’বর্ষ’ণে’র অ’ভি’যো’গ ই’জা’রাদার বসির উদ্দিনের বি’রু’দ্ধে মেহেরপুরের গাংনী সী’মা’ন্তে ৬ জনকে পু’শ’ই’নের চেষ্টা রু’খে দিলো বিজিবি প্রাগপুরের ৪ নম্বর ওয়ার্ডে আলোচনায় তরুণ সমাজসেবক আসাদুল হক

আন্তর্জাতিক সাদাছড়ি দি’ব’স আজ: কুষ্টিয়ায় সাড়ে ৮ হাজার দৃ’ষ্টিপ্র’তিব’ন্ধী

notuntimes / ২৮ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬

আন্তর্জাতিক সাদাছড়ি দিবস আজ: কুষ্টিয়ায় সাড়ে ৮ হাজার দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী

*ফুটপাত দখল, ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক ও কর্মসংস্থানের সংকটে অনিশ্চিত তাদের জীবন*

দিগন্ত ডেস্ক :

জন্ম থেকেই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী আলফাজ আহম্মেদ। পারিবারিক সহযোগিতা ও অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে পুঁজি করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। এখন তিনি খোকসার গোসাইডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। শিক্ষা ও পেশাগত জীবনে সাফল্য পেলেও প্রতিদিনের পথচলায় তাঁকে মোকাবিলা করতে হয় ফুটপাত দখল, অপরিকল্পিত সড়ক ও মানুষের অসচেতনতার মতো নানা প্রতিবন্ধকতায়।

একই অভিজ্ঞতা কুষ্টিয়ার কুমারখালীর বাঁশগ্রামের শিক্ষার্থী স্বপন কুমারের। এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়ে তিনি ভর্তি হয়েছেন কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে। আর কুষ্টিয়ার সমন্বিত দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষা কার্যক্রম ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিশু-কিশোরদের প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত আব্দুর রাজ্জাকও দেখছেন, চলাচলের নিরাপত্তা থেকে কর্মসংস্থান—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁদের জন্য রয়েছে নানা বাধা।

তাঁদের সবার আক্ষেপ, বিশ্ব সাদাছড়ি নিরাপত্তা দিবস যেন আলোচনা সভা ও আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। দিবস আসে, দিবস যায়; কিন্তু নিরাপদে চলাচল, সামাজিক মর্যাদা ও কর্মসংস্থানের সংকটের স্থায়ী সমাধান হয় না।

আজ বৃহস্পতিবার ( ১৫ অক্টোবর) বিশ্ব সাদাছড়ি নিরাপত্তা দিবস। দিবসটি সামনে রেখে কুষ্টিয়ায় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের জীবনযাত্রার বাস্তব চিত্রে উঠে এসেছে ফুটপাত দখল, ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক, জনসচেতনতার অভাব ও কর্মক্ষেত্রে সুযোগের সীমাবদ্ধতা। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, প্রতীকী সাদাছড়ি বিতরণ কিংবা এক দিনের কর্মসূচির বাইরে গিয়ে এসব সমস্যা সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

*ফুটপাত দখলে, ঝুঁকিতে পথচলা*

সরেজমিনে কুষ্টিয়া শহরসহ বিভিন্ন উপজেলার সড়ক ও ফুটপাত ঘুরে দেখা যায়, কোথাও ফুটপাত দখল করে বসেছে ভ্রাম্যমাণ দোকানপাট, কোথাও ফেলে রাখা হয়েছে ইট-বালু ও নির্মাণসামগ্রী। আবার কোথাও বিদ্যুতের খুঁটি, খোলা ড্রেন ও অপরিকল্পিত অবকাঠামো পথচারীদের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করছে।

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের পথ চলতে সহায়তার জন্য ফুটপাতে স্থাপন করা বিশেষ খাঁজকাটা টাইলস বা ট্যাকটাইল টাইলসও বিভিন্ন স্থানে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে সাদাছড়ি ব্যবহার করেও নির্বিঘ্নে চলাচল করা কঠিন হয়ে পড়েছে তাঁদের জন্য। অনেক ক্ষেত্রে বাধ্য হয়ে মূল সড়কে নেমে আসতে হচ্ছে। এতে দ্রুতগতির যানবাহনের সঙ্গে সংঘর্ষসহ গুরুতর দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

প্রতিবন্ধকতা শুধু ফুটপাতেই সীমাবদ্ধ নয়। সড়ক পারাপারের সময় চালকদের অসচেতনতা, শব্দভিত্তিক ট্রাফিক সংকেতের অভাব এবং পথচারীদের অসহযোগিতাও তাঁদের চলাচলকে অনিরাপদ করে তুলছে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আলফাজ আহম্মেদ বলেন, “সাদাছড়ি শুধু চলার লাঠি নয়, এটি আমাদের আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। আমরা চোখে দেখতে পাই না, কিন্তু সাদাছড়ি আমাদের পথ চলতে সাহস জোগায়। অথচ ফুটপাত দখল ও চালকদের অসচেতনতার কারণে প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিয়ে চলতে হয়। অনেক সময় পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া মানুষটিও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন না।”

তাঁর মতে, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের মধ্যে সাদাছড়ি বিতরণের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। তাঁদের নিরাপদ চলাচলের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে অন্যের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারেন।

কুমারখালীর বাঁশগ্রামের শিক্ষার্থী স্বপন কুমার এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছেন। বর্তমানে তিনি কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণিতে পড়ছেন। পড়াশোনায় সাফল্য অর্জন করলেও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হিসেবে স্বাভাবিকভাবে চলাচলের ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাঁকে।

স্বপন কুমারের মতে, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদেরও অন্য নাগরিকদের মতো নিরাপদে চলাচল, শিক্ষা গ্রহণ ও সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। কিন্তু শুধু একটি দিবস পালন করে তাঁদের জীবনমানের পরিবর্তন সম্ভব নয়।

তিনি মনে করেন, দিবসের বাইরেও আলোচনা সভা, সেমিনার ও প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে হবে। একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে দেখলে কীভাবে সহযোগিতা করতে হবে, সাদাছড়ি ব্যবহারকারীর সংকেত বুঝে চালকদের কী ধরনের আচরণ করা উচিত—এসব বিষয়ে মানুষের ধারণা থাকা প্রয়োজন।

স্বপন কুমারের ভাষ্য, ফুটপাত দখল ও চালকদের অসচেতনতার কারণে স্বাধীনভাবে চলাচল করতে ভয় পান দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরা। অনেক সময় দুর্ঘটনার শিকার হতে হয়। অথচ আশপাশের মানুষ একটু সহযোগিতা করলেই অনেক পরিস্থিতি সহজ হয়ে উঠতে পারে।

*কর্মসংস্থানে প্রতিবন্ধকতা*

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিশু-কিশোরদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত আব্দুর রাজ্জাক। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামের ইতিহাসে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর তিনি এই জনগোষ্ঠীর শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা ও প্রশিক্ষণের কাজে যুক্ত হয়েছেন।

তাঁর মতে, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সক্ষমতা বিকাশে শিক্ষার পাশাপাশি প্রয়োজন উপযোগী প্রশিক্ষণ, সহায়ক প্রযুক্তি এবং কর্মসংস্থানের বাস্তব সুযোগ। শুধু সহানুভূতি দেখানো নয়, তাঁদের দক্ষতা ও যোগ্যতার স্বীকৃতি দিয়ে সমাজের মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে হবে।

বর্তমানে স্ক্রিন রিডার, ব্রেইল ডিসপ্লে ও অন্যান্য সহায়ক প্রযুক্তি ব্যবহার করে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি, যোগাযোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করতে পারেন। কিন্তু উপযুক্ত কর্মপরিবেশ, প্রযুক্তির সহজলভ্যতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নিয়োগব্যবস্থার অভাবে তাঁদের অনেকে যোগ্যতা অনুযায়ী কাজের সুযোগ পান না।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীবান্ধব কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং দক্ষতা অনুযায়ী নিয়োগের সুযোগ বাড়ানো গেলে তাঁদের প্রতিভা ও সামর্থ্য দেশের উন্নয়নে কাজে লাগানো সম্ভব।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, কুষ্টিয়া জেলায় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের সংখ্যা ৮ হাজার ৪১২ জন। এর মধ্যে কুষ্টিয়া পৌরসভায় ১ হাজার ৭ জন, সদর উপজেলায় ১ হাজার ৪২৫ জন, মিরপুরে ১ হাজার ৭২৭ জন, ভেড়ামারায় ৮৪৭ জন, কুমারখালীতে ১ হাজার ৪৭০ জন, খোকসায় ৬৩৯ জন এবং দৌলতপুরে ১ হাজার ২৯৭ জন।

কুষ্টিয়া জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের দাবি, তালিকাভুক্ত সবাই সরকারি সহায়তার আওতায় রয়েছেন। তবে আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি তাঁদের নিরাপদ চলাচল, শিক্ষার পরিবেশ, সামাজিক অংশগ্রহণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও।

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের নিরাপদ ও স্বাধীন চলাচল নিশ্চিত করতে ফুটপাত দখলমুক্ত করা, ট্যাকটাইল টাইলস সঠিকভাবে স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং খোলা ড্রেন ও অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা দূর করা জরুরি। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা, শব্দভিত্তিক ট্রাফিক সংকেত এবং গণপরিবহনে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীবান্ধব সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।

চালক, পথচারী ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তাঁরা।

এ বিষয়ে কুষ্টিয়া জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক আব্দুল লতিফ সেখ জানান, বিশ্ব সাদাছড়ি নিরাপত্তা দিবস উপলক্ষে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এসব সমস্যা ও সমাধানের প্রস্তাব তুলে ধরা হবে।

বিশ্ব সাদাছড়ি নিরাপত্তা দিবসের মূল তাৎপর্য দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের নিরাপদ চলাচল, স্বাধীনতা ও সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা। তাই দিবসটি যেন কেবল ব্যানার-ফেস্টুন, আলোচনা সভা কিংবা প্রতীকী কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ না থাকে। ফুটপাত থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সড়ক থেকে কর্মক্ষেত্র—সব জায়গায় নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করা। তবেই সাদাছড়ি দিবসের অঙ্গীকার বাস্তবে রূপ পাবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!