গত বছরের পুরো সময়ের তুলনায় খুন বেশি; ১৮ থানায় প্রায় পাঁচ হাজার মামলা, আলোচনায় দুই স্কুলশিক্ষার্থীর হত্যাকাণ্ড
কুমিল্লায় অপরাধের পরিসংখ্যানে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসেই জেলায় ১১১টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। গত বছরের পুরো ১২ মাসে এ সংখ্যা ছিল ১০৩। অর্থাৎ, বছরের শেষ তিন মাস বাকি থাকতেই গত বছরের হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে। একই সময়ে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ১৩৯টি, যা গত বছরের পুরো সময়ের ১৪৪টি ঘটনার কাছাকাছি।
পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কুমিল্লার ১৮টি থানায় বিভিন্ন অপরাধে মোট ৪ হাজার ৯৬৩টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে নারী ও শিশু নির্যাতনের ২৩২টি, অপহরণের ১৪টি এবং ডাকাতির ৩৬টি ঘটনা রয়েছে। চুরি, ছিনতাই ও অন্যান্য অপরাধের ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে।
সম্প্রতি কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী, সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম এবং আরেক স্কুলছাত্রী হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা জেলায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
পুলিশের মাসভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, জানুয়ারিতে বিভিন্ন অপরাধে ৪৯১টি মামলা হয়। ফেব্রুয়ারিতে তা কমে ৪০৭টিতে দাঁড়ালেও মার্চে বেড়ে হয় ৫১৭টি এবং এপ্রিলে ৫৮৪টি। মে মাসে মামলা হয় ৬১২টি, জুনে ৫৭৭টি, জুলাইয়ে ৫০৯টি এবং আগস্টে ৫৮৫টি। সেপ্টেম্বরে ৬৮১টি মামলা নথিভুক্ত হয়, যা এই নয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।সেপ্টেম্বরে খুন হয় ১৬টি। অন্যদিকে জুনে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ছিল সর্বোচ্চ ৪১টি। সেপ্টেম্বরে এ ধরনের ঘটনা ঘটে ৩৪টি।
গত ২৫ এপ্রিল রাতে চট্টগ্রাম থেকে বাসে কুমিল্লায় এসে মহাসড়কের ঝাগুরঝুলি এলাকায় নামার পর ছিনতাইকারীদের হাতে নিহত হন কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী। এ ঘটনায় সোহাগ, এমরান, রাহাত ও সুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গত ৭ আগস্ট দেবিদ্বার উপজেলা সদরে ফরিদা ইয়াসমিন নামে এক বৃদ্ধাকে হত্যার পর তাঁর মরদেহের খণ্ড বিভিন্ন স্থানে ফেলে দেওয়া হয়। পরদিন একটি ডোবা থেকে মরদেহের খণ্ড উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় লাইলী আক্তার ও আমির হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সেপ্টেম্বরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নাহিদা বেগমের ছেলে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। ১৯ সেপ্টেম্বর বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় সে। পরদিন লালমাই পাহাড়ের একটি জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় চার কিশোরকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, আইফোনের জন্য তাকে হত্যা করা হয়।
এরপর গত ৪ অক্টোবর কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকার বাসা থেকে বান্ধবীর বাড়িতে যাওয়ার কথা বলে বের হয় সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রী। ৮ অক্টোবর লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি ধানক্ষেত থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমন মিয়া ধর্ষণের পর হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফর রহমানের ভাষ্য, হত্যা ও ধর্ষণসহ বিভিন্ন অপরাধের রহস্য দ্রুত উদ্ঘাটনে পুলিশ কাজ করছে। জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে থানা পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও মাঠে রয়েছে। কিশোর গ্যাং ও মাদকবিরোধী অভিযানসহ বিভিন্ন অভিযানে দুই হাজারের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তবে অপরাধের রহস্য উদ্ঘাটন এবং অপরাধ প্রতিরোধ এক বিষয় নয়। অপরাধ সংঘটনের পর আসামি গ্রেপ্তার করা পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হলেও ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড ও অন্যান্য অপরাধের পরিসংখ্যান প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, সেই প্রশ্ন সামনে আনছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক—সুজনের কুমিল্লা সভাপতি শাহ মো. আলমগীর খান মনে করেন, শুধু অভিযান চালিয়ে অপরাধ বন্ধ করা সম্ভব নয়। পারিবারিক ও নৈতিক শিক্ষার পাশাপাশি সামাজিকভাবে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, প্রচলিত পদ্ধতিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নতুন করে কার্যকর কৌশল নির্ধারণ করা জরুরি। কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে পরিবারকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে এবং শিশু-কিশোরদের মোবাইল ফোন ব্যবহারের বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন থাকতে হবে।কুমিল্লা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এর পাবলিক প্রসিকিউটর মুহাম্মদ বদিউল আলম সুজন বলেন, ধর্ষণ মামলার তদন্তে ধীরগতি, তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন, চিকিৎসা পরীক্ষা ও ডিএনএ প্রতিবেদন পেতে বিলম্ব এবং সাক্ষী হাজির করতে না পারার কারণে বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয়। এতে ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার পেতে সমস্যা হয়।
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. শারমিন সুলতানা জানান, অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষার আগে গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্ট হয়ে যায়। পোশাকসহ অন্যান্য আলামত যথাযথভাবে সংরক্ষণ না করায় ডিএনএ পরীক্ষার ফল পেতেও সমস্যা হতে পারে।
পরিসংখ্যান বলছে, কুমিল্লায় চলতি বছরের প্রথম নয় মাসেই হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা গত বছরের পুরো সময়ের চেয়ে বেশি হয়েছে। ধর্ষণের সংখ্যাও গত বছরের মোট ঘটনার কাছাকাছি পৌঁছেছে। বিশেষ করে স্কুলপড়ুয়া শিশুদের হত্যাকাণ্ড পরিবার ও অভিভাবকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
অপরাধের পর আসামি শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের পাশাপাশি অপরাধ সংঘটনের কারণ চিহ্নিত করা, ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি প্রতিরোধ, তদন্তের মান উন্নয়ন এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। কুমিল্লায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন, পুলিশ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবার সমন্বিতভাবে কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে, এখন সেটিই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।