দেশে আসলো প্রবাসী রাজুর লাশ, এলাকায় শোকের ছায়া
মেহেরপুর প্রতিনিধি: পরিবারের সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে আর সংসারের বোঝা মাথায় নিয়ে প্রায় ১ বছর ৩ মাস আগে রাশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন মো: আলাল হোসেন রাজু(২৮)।কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস সেই প্রবাসী টাকার মেশিনটা কাজ করতে গিয়ে রাশিয়ার আমুর অঞ্চলের আমুর গ্যাস কেমিক্যাল কমপ্লেক্সে ভয়াবহ বিস্ফোরণে নিহত হয়ে পাড়ি জমান না ফেরার দেশে।মৃত্যুর ১৫ দিন পর দেশে আসে তাঁর নিথর দেহ।পরিবারের লোকজন শেষবারের মতো কফিনে করে তার লাশ নিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করেন।লাশ নিজ গ্রামে পৌঁছানোর পর এক পলক দেখার জন্য ছুটে আসে বিভিন্ন গ্রামের মানুষ।চারিদিকে নেমে আসে শোকের ছায়া।বাকরুদ্ধ পরিবারের সবাই।
বুধবার দুপুরে কফিনবন্দি অবস্থায় তার মরদেহ মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার মটমুড়া ইউনিয়নের হোগলবাড়িয়া গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়।
নিহত আলাল হোসেন রাজু উপজেলার হোগলবাড়িয়া গ্রামের মোঃ খাইরুল ইসলামের ছেলে।সে রাশিয়ায় চীনের সিনোপ্যাক ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানিতে কর্মরত ছিল।
স্থানীয়রা জানান,অভাব অনটনের সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরে আনতে দীর্ঘদিন প্রবাসে অবস্থান করছিল আলাল হোসেন রাজু।১৫ দিন পর তাঁর লাশ আসে নিজ বাড়িতে।গ্রামে নেমে আসে শোকের ছায়া।রাজুর নিথর দেহ দেখতে বিভিন্ন গ্রাম থেকে ছুটে আসে মানুষ।ছোট সন্তানটির জন্য খুব কষ্ট হচ্ছে।সে বাবাকে পেল ঠিকই কিন্তু মৃত অবস্থায়।কিছু গল্প থাকে যে গল্পের কোন সমাপ্তি হয় না।সারা জীবন সেই ব্যথা বহন করে বেড়াতে হয়।তেমন এই সন্তান ধীরে ধীরে বড় হবে আর বাবার কষ্ট অনুভব করে বয়ে বেড়াতে হবে বাবা হারানোর ব্যথা।
পরিবার সূত্র যায়, রাশিয়ায় যাওয়ার সময় রাজুর স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। দেশ ছাড়ার ১৭ দিন পর তার স্ত্রী একটি পুত্রসন্তান জন্ম নেয়। বিদেশে বসে সন্তানের জন্মের খবর পেয়ে রাজুর আনন্দের শেষ ছিল না।শেষ পর্যন্ত তার সন্তানের মুখ আর দেখা হলো না। রাজুর স্ত্রীকে কিভাবে সান্তনা দেব সে ভাষাও নেই।
নিহত রাজুর বাবা খাইরুল ইসলাম বলেন, ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়ে কত স্বপ্ন দেখেছিলাম।অভাব অনটনের সংসারে একটু সুখ আসবে।স্ত্রী সন্তান ও পরিবারের সবাইকে নিয়ে হাসিখুশি থাকবে।আমার রাজু বলেছিল কাজ করে কিছু টাকা জমিয়ে দেশে ফিরবো।শেষ পর্যন্ত সে দেশে ফিরল ঠিকই। তবে লাশ হয়ে।আমি বাবা হয়ে এই ব্যাথা সহ্য করব কিভাবে।আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে সন্তানের জন্য।আমার সন্তান রাজু একদিন আমার কোল জুড়ে এসেছিল।সেদিন আনন্দে কেঁদেছিলাম।আজ আমাকে শেষবারের মতো কাঁদিয়েই চলে গেল।আজ নিজের হাতে তাকে কবর দেব।একজন বাবার কাঁধে সন্তানের লাশ যে কত ভারী পৃথিবীর কাউকে সেই কষ্ট বলে বোঝানো সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, রাজুর মা ছেলের মৃত্যুর শোকে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। স্বামীকে হারিয়ে রাজুর স্ত্রীও অসুস্থ হয়ে পড়েছে।
নিহত আলাল হোসের ভাই জালাল উদ্দিন বলেন, গত ২৫ আগস্ট রাশিয়ার আমুর অঞ্চলের গ্যাস কেমিক্যাল কমপ্লেক্সে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এরপর থেকে নিখোঁজ ছিলেন আলাল। চার দিন পর ঘটনাস্থল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয় বলে জানতে পারি।এরপর আমরা ঢাকার দুতাবাসে যোগাযোগ করে জানতে পারি আমার ভাই সত্যিই আর বেঁচে নেই।এরপর থেকে আমরা সকল কাগজ প্রসেসিং শেষ করি। আজ আমার ভাইয়ের মরদেহ নিজ বাড়িতে এসে পৌঁছালো।
তিনি আরও বলেন, পরিবারের স্বচ্ছলতা ফেরাতে প্রায় ১৩ মাস আগে ধার-দেনা করে রাশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিল।সেখানে চীনের একটি কোম্পানিতে কাজ করতো।তবে এটা সত্য যার যেখানে মৃত্যু লেখা আছে সেখানে হবেই।কিন্তু কিছু মৃত্যু মেনে নেওয়া খুব কঠিন।ভাইকে নিজের হাতে কবর দেব। এটা ভাবতেই বুকটা ফেটে যাচ্ছে।
এ তথ্য নিশ্চিত করে গাংনী উপজেলার মটমুড়া ইউনিয়ন পরিষদের ৩ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মোঃ আয়েজ উদ্দীন বলেন, আলালের মৃত্যুর ঘটনায় পুরো ইউনিয়নের মানুষ শোকাহত।সে আচার আচারনের দিক থেকে খুবই শান্ত প্রকৃতির ছিল। তার ছোট বাচ্চাটির জন্য খুব কষ্ট লাগছে।শিশুটি তার বাবাকে আর কোনদিন পাবে না।নিহত রাজুর বাবা, মা ও স্ত্রীকে পৃথিবীর কোন ভাষা দিয়ে বোঝানো সম্ভব নয়।বুধবার বিকেল পাঁচটায় জানাজা শেষে রাজুর দাফন সম্পন্ন হয়।