সম্পাদকীয়
নদী প্রধান কুষ্টিয়ায় জীবন উদ্ধারে কেন খুলনার ডুবুরির ওপর নির্ভরতা?নদী আছে, দুর্ঘটনা আছে; নেই ডুবুরি—কুষ্টিয়ায় জীবন উদ্ধারে খুলনার অপেক্ষা
কুষ্টিয়া ফায়ার সার্ভিসে আধুনিক ডুবুরি সরঞ্জাম পানির নিচে অনুসন্ধান ক্যামেরা ও প্রয়োজনীয় রেসকিউ বোটের প্রয়োজন।
কুষ্টিয়া নদীঘেরা একটি জেলা। পদ্মা, গড়াই, কুমার, কালীগঙ্গা, হিসনা ও সাগরখালীসহ বিভিন্ন নদ-নদী এ জেলার মানুষের জীবন, কৃষি, জীবিকা ও পরিবেশের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, কুষ্টিয়ার ওপর দিয়ে ছয়টি নদীর প্রবাহ রয়েছে। এর মধ্যে পদ্মা জেলার প্রধান নদী এবং গড়াই পদ্মার গুরুত্বপূর্ণ শাখা নদী। কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসনের তথ্যেও পদ্মা, গড়াই, কালীগঙ্গা ও হিসনাসহ বিভিন্ন নদ-নদীর উল্লেখ রয়েছে।
কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—এই নদীগুলোতে কেউ নিখোঁজ হলে দ্রুত উদ্ধার অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে কুষ্টিয়ার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। অনেক সময় স্থানীয়ভাবে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত ডুবুরি ও আধুনিক সরঞ্জাম না থাকায় খুলনা থেকে ডুবুরি দল আসার অপেক্ষা করতে হয়। অথচ পানিতে নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ।
একজন মানুষ নদীতে নিখোঁজ হওয়ার পর তার পরিবার যখন নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে প্রিয়জনের ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকে, তখন দূরবর্তী জেলা খুলনা থেকে উদ্ধারকারী দল আসতে সময় লাগা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। উদ্ধার অভিযান যত বিলম্বিত হয়, জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনাও তত কঠিন হয়ে পড়ে।প্রশ্ন হচ্ছে—নদীবহুল কুষ্টিয়ায় কেন স্থায়ী ও পূর্ণাঙ্গ ডুবুরি উদ্ধারব্যবস্থা থাকবে না?
কুষ্টিয়ায় ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রশিক্ষিত ডুবুরি দল, আধুনিক রেসকিউ বোট, লাইফ-সাপোর্ট সরঞ্জাম, পানির নিচে অনুসন্ধানের আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম থাকা জরুরি। দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যেন স্থানীয় দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করতে পারে, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
শুধু ডুবুরি দল থাকলেই হবে না। জেলার পদ্মা, গড়াইসহ দুর্ঘটনাপ্রবণ নদী ও নৌপথগুলো চিহ্নিত করে সেখানে জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। ফায়ার সার্ভিস, জেলা প্রশাসন, নৌ-পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বিত যোগাযোগব্যবস্থাও থাকতে হবে।
প্রয়োজনে খুলনা থেকে বিশেষজ্ঞ ডুবুরি দল আসবে এটি সহায়ক ব্যবস্থা হতে পারে। কিন্তু প্রাথমিক উদ্ধার কার্যক্রমের জন্য কুষ্টিয়াকে অন্য জেলার ওপর নির্ভরশীল রাখা কোনোভাবেই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হতে পারে না।
একটি নদীবহুল জেলার মানুষের জীবন রক্ষায় স্থানীয় পর্যায়ে উদ্ধার সক্ষমতা থাকা মৌলিক প্রয়োজন। আজ যে পরিবারটি নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে, কাল সেই অপেক্ষায় অন্য কোনো পরিবারকেও যেন দাঁড়াতে না হয়—এটাই হওয়া উচিত প্রশাসনের লক্ষ্য।কুষ্টিয়ায় নদীতে নিখোঁজ হলে ‘খুলনা থেকে ডুবুরি আসবে’—এই বাস্তবতার অবসান ঘটাতে হবে। মানুষের জীবন বাঁচাতে কুষ্টিয়াতেই স্থায়ী প্রশিক্ষিত ডুবুরি দল ও আধুনিক উদ্ধার সরঞ্জাম নিশ্চিত করতে হবে।
জীবন উদ্ধারে এক ঘণ্টার বিলম্বও কখনো কখনো অনেক বড় মূল্য দাবি করে। তাই প্রতিকারের উদ্যোগ আজই নিতে হবে দুর্ঘটনার পর নয়, দুর্ঘটনার আগেই।