পানির রাজ্যে ডিঙিই ভরসা
দৌলতপুর (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি:
পদ্মায় পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের চরাঞ্চলে বাড়ছে ডিঙি নৌকার কদর। পানিতে ডুবে গেছে চরের রাস্তাঘাট ও নিম্নাঞ্চল। এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে যাওয়া, বাজারে আসা-যাওয়া কিংবা গবাদিপশু ও প্রয়োজনীয় মালামাল পারাপারে চরবাসীর প্রধান ভরসা এখন ছোট এই নৌকা। ফলে বন্যার পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে কাঠ ও টিনের তৈরি ডিঙি নৌকার চাহিদা। আর সেই চাহিদা মেটাতে রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের ভাগজোত বাজারে নৌকা তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগররা।
রামকৃষ্ণপুর ও চিলমারী ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় ৩৫ গ্রামের প্রায় ৬০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। পানির কারণে অনেক সড়ক ও গ্রামের ভেতরের যোগাযোগপথ তলিয়ে গেছে। কোথাও হাঁটুসমান, কোথাও তারও বেশি পানি জমেছে। এতে স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হওয়ায় ছোট ডিঙি নৌকাই হয়ে উঠেছে চরবাসীর নিত্যদিনের সঙ্গী।
সরেজমিনে রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের ভাগজোত বাজারে গিয়ে দেখা যায়, কাঠের আসবাবপত্র তৈরির কারিগরদের অনেকেই এখন ডিঙি নৌকা তৈরিতে ব্যস্ত। কেউ কাঠ মাপছেন, কেউ হাতুড়ি-বাটালি দিয়ে কাঠের কাঠামো তৈরি করছেন, আবার কেউ নৌকার গায়ে টিন লাগাচ্ছেন। ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী দ্রুত নৌকা তৈরির চেষ্টা করছেন তাঁরা।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পদ্মার পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চরাঞ্চলের রাস্তাঘাট তলিয়ে গেছে। বাড়ি থেকে বের হওয়া, বাজারে যাওয়া কিংবা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আনা-নেওয়ার জন্য এই ডিঙি নৌকা ছাড়া অনেকটা অচল হয়ে পড়েছেন চরবাসী। তাই সামর্থ্য অনুযায়ী অনেকেই নতুন ডিঙি নৌকা কিনছেন।
রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের ভাগজোত বাজারে কথা হয় চরপাড়া এলাকার বাসিন্দা রাকিবুল ইসলামের সাথে তিনি বলেন, ‘পানি বাড়ার পর আমাদের চরের চলাচলের রাস্তা ডুবে গেছে। বাড়ি থেকে বের হতে হলে নৌকাই একমাত্র ভরসা। তাই প্রয়োজনের তাগিদে নৌকা কিনতে হয়েছে। ৩ হাজার ১৫০ টাকা দিয়ে নতুন এই ডিঙি কিনে নিয়ে যাচ্ছি।’
চরাঞ্চলের আরেক বাসিন্দা মোজাম্মেল হোসেন বলেন, ‘পানি বাড়লে আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা অনেকটাই থেমে যায়। বাজারে যাওয়া থেকে শুরু করে গবাদিপশু ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আনা-নেওয়ার জন্য এই ডিঙি নৌকা ছাড়া উপায় থাকে না।’
ভাগজোত বাজারের ফার্নিচার ব্যবসায়ী জাহিদুল ইসলাম কনক বলেন, বন্যার সময় প্রতিবছরই ডিঙি নৌকার চাহিদা বাড়ে। এবারও পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ নৌকা কিনতে আসছেন। এখন পর্যন্ত তিনি প্রায় ১০০টি ডিঙি নৌকা বিক্রি করেছেন। গত বছর বিক্রি করেছিলেন প্রায় ২০০টি। আকার ও কাঠের মানভেদে প্রতিটি নৌকার দাম ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকা।
স্থানীয় কারিগররা জানান, কাঠ ও টিনের সমন্বয়ে তৈরি এসব নৌকা তুলনামূলক হালকা। ফলে অল্প পানিতেও সহজে চালানো যায়। বন্যার মৌসুমে প্রতিবছরই এসব ডিঙি নৌকার চাহিদা বেড়ে যায়। এবারও চাহিদা বাড়ায় অর্ডার অনুযায়ী নৌকা সরবরাহ করতে তাঁদের ব্যস্ত সময় পার করতে হচ্ছে। পুরো বন্যার মৌসুমে স্থানীয় কারিগররা মিলিয়ে এক হাজারের বেশি ডিঙি নৌকা বিক্রি করেন বলে জানান তাঁরা।
এদিকে পদ্মায় পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। গত শুক্রবার সন্ধ্যা ৬ টা থেকে শনিবার সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টায় পানি বেড়েছে ৪ সেন্টিমিটার। যা বিপদ সিমার ৭৪ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টায় হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পানির উচ্চতা ছিলো ১৩ দশমিক ০২ সেন্টিমিটার। এর আগে এক সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১২ সেন্টিমিটার করে পানি বাড়ছিল।
পানি বাড়তে থাকালে চরাঞ্চলে ডিঙি নৌকার প্রয়োজনীয়তাও আরও বাড়বে। স্থানীয়দের ভাষ্য, বন্যার পানি যতদিন থাকবে, ততদিন এই ছোট নৌকাই হবে তাদের চলাচল ও দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর অন্যতম প্রধান অবলম্বন।