ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় গাজায় অন্তত ১২ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। গত বছর হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করে গাজায় এ হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এ হামলার খবর জানা গেছে।
গত শুক্রবার খান ইউনিসে পুলিশের একটি গাড়িকে লক্ষ্য করে চালানো হামলায় তিনজন পথচারীসহ অন্তত আটজন নিহত হন। এ ছাড়া গাজা শহরে পৃথক হামলায় আরও দুই পুলিশ কর্মকর্তা প্রাণ হারান। উত্তরাঞ্চলীয় বেইত লাহিয়াতে একটি বাড়িতে বোমা হামলায় আরও দুজন নিহত হয়েছেন।
এদিকে গাজার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছে, বেসামরিক এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজ করা পুলিশ বাহিনীর ওপর ইসরায়েলি হামলা বন্ধে যেন দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
খান ইউনিসে একটি বিরোধ মেটাতে গিয়ে পুলিশের ওপর এই হামলার ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ‘বেসামরিক পুলিশ কর্মকর্তাদের ওপর হামলা হওয়ার পরও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর নীরবতা ইসরায়েলি দখলদারির প্রতি এক ধরনের সমর্থন। এটি তাদের আন্তর্জাতিক আইন দ্বারা সুরক্ষিত একটি বেসামরিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আরও অপরাধ করতে উৎসাহিত করছে। এই পুলিশ বাহিনী গাজার নাগরিকদের প্রাত্যহিক জীবনে নানা সেবা দিয়ে থাকে এবং তাদের ওপর হামলার কোনো যৌক্তিকতা নেই।’
আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, দখল হওয়া ভূখণ্ডে অপরাধী চক্রগুলোর সঙ্গে হাত মিলিয়ে পরিকল্পিতভাবে গাজার পুলিশ কর্মকর্তাদের হত্যা করছে ইসরায়েল। ২০২৩ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া যুদ্ধের সময়ও ইসরায়েলি বাহিনী নিয়মিতভাবে ত্রাণবাহী বহরের নিরাপত্তায় নিয়োজিত কর্মকর্তাদের লক্ষ্যবস্তু করেছিল, যার ফলে লুটতরাজ বেড়ে গিয়ে গাজায় খাদ্য সংকটকে আরও তীব্র করেছিল।
গত বছরের অক্টোবরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়, যার ফলে ইসরায়েলি বোমাবর্ষণের তীব্রতা কিছুটা কমেছিল। তবে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে এখন পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৯৮৪ জন নিহত এবং ২ হাজার ২৩৫ জন আহত হয়েছেন। চলতি সপ্তাহেই বুধবারের এক হামলায় তিন শিশুসহ পাঁচজন নিহত হন।
যুদ্ধের শুরু থেকে এ পর্যন্ত নিহতের মোট সংখ্যা ৭২ হাজার ৫০০ ছাড়িয়েছে এবং আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭২ হাজার জনেরও বেশি মানুষ। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই হতাহতের সংখ্যা গাজার মোট ২০ লাখ জনসংখ্যার ৭ শতাংশের বেশি। ইসরায়েলি হামলায় গাজার অধিকাংশ ভবনই এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
শীর্ষস্থানীয় মানবাধিকার সংস্থা এবং জাতিসংঘের তদন্তকারীরা এই ইসরায়েলি অভিযানকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কট্টরপন্থী সরকারের অধীনে ইসরায়েল গাজায় বোমা হামলার পাশাপাশি দক্ষিণ লেবাননেও হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, যা হিজবুল্লাহর সঙ্গে আলাদা একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন।
শুক্রবার হামাস এই প্রাণঘাতী হামলাকে ইসরায়েলি সরকারের ‘নজিরবিহীন রক্তাক্ত ও ফ্যাসিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি’ বলে অভিহিত করেছে। দলটি জানায়, ‘যুদ্ধাপরাধী নেতানিয়াহুর এই উসকানি মূলত যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতাকারী এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ব্যর্থতাকে ফুটিয়ে তোলে।’
এদিকে, যুদ্ধবিরতির ছয় মাস পার হলেও ট্রাম্পের ১২ দফা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ইসরায়েল এখনো গাজার অধিকাংশ এলাকা দখল করে রেখেছে এবং পুনর্গঠন কাজও শুরু হয়নি। চুক্তিতে উল্লিখিত আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনীও এখনো গঠন করা সম্ভব হয়নি।
গত ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্প তাঁর ঘোষিত ‘বোর্ড অব পিস’ আহ্বান করেন, যা ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাটদের একটি কাউন্সিলের মাধ্যমে গাজা শাসন করার কথা। তবে এই বাহিনী কখন বা কীভাবে গাজার সরকারি সংস্থাগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেবে, তা এখনো অস্পষ্ট।