দৌলতপুরে পদ্মার পানি বৃদ্ধি,৩৫ গ্রামের পানিবন্দী ৭০ হাজার মানুষ ব্যাহত ২৮ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শ্রেণী কার্যক্রম
নিজস্ব প্রতিবেদক
টানা বৃষ্টি ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা ঢলে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এতে উপজেলার রামকৃষ্ণপুর ও চিলমারী ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে ৩৫ গ্রামের অন্তত ৭০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। এছাড়া ফিলিপনগর ইউনিয়নের ফিলিপনগর পদ্মার চরের কিছু পরিবারের ঘর বাড়ি প্লাবিত হয়েছে। ডুবে গেছে সড়ক ও আবাদি জমি। পানি ওঠায় ২৫টি সরকারি প্রাথমিক ও তিনটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ রয়েছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক কার্যক্রম অব্যাহত আছে।
পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে চরাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগও বাড়ছে। রান্নার জায়গা ও চলাচলের পথ তলিয়ে৷৷ যাওয়ায় অনেক পরিবার বিপাকে পড়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বিষধর সাপের উপদ্রব। ঘরবাড়ি ও বসতভিটার আশপাশে সাপের আনাগোনায় আতঙ্কে দিন কাটছে বানভাসি মানুষের।
পাবনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের হাইড্রোলজি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ভারী বৃষ্টি ও উজানের ঢল অব্যাহত থাকায় গত এক সপ্তাহে পদ্মা নদীতে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১০ থেকে ১২ সেন্টিমিটার করে পানি বেড়েছে। শুক্রবার সকাল ৯টায় হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পদ্মা নদীর পানির উচ্চতা ছিল ১৩ দশমিক ০২ সেন্টিমিটার পরে সন্ধা ৬ টার পর্যন্ত নতুন করে আর পানি বৃদ্ধি পাইনি । ওই পয়েন্টে বিপৎসীমা ১৩ দশমিক ৮০ সেন্টিমিটার। অর্থাৎ বিপৎসীমার মাত্র ৭৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে পদ্মার পানি।
পাবনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের হাইড্রোলজি বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ইলিয়াস হোসেন বলেন, ‘উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও টানা বৃষ্টির কারণে পদ্মায় পানি দ্রুত বাড়ছে। পানি বৃদ্ধির প্রবণতা এখনো অব্যাহত রয়েছে।’
স্থানীয় সূত্র জানায়, হঠাৎ পানি বেড়ে যাওয়ায় চরাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। সড়কগুলো তলিয়ে যাওয়ায় নৌকা, ডিঙি ও ভেলা হয়ে উঠেছে চলাচলের প্রধান মাধ্যম। অনেক পরিবারের রান্নার জায়গা পানিতে তলিয়ে গেছে। দেখা দিয়েছে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট। গবাদিপশু নিয়েও বিপাকে পড়েছেন কৃষক ও খামারিরা।
চিলমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান বলেন, উজান থেকে নেমে আসা ঢলের পানিতে গত দুই-তিন দিনে তাঁর ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ১৯টি গ্রামের মধ্যে ১৭টির নিম্নাঞ্চলের ঘরবাড়িতে পানি উঠেছে। এতে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। স্কুলগুলোতে পাঠদান বন্ধ রয়েছে। পানি ওঠার পর থেকে বিষধর সাপের উপদ্রবও বেড়েছে। ঘর থেকে বের হতেও ভয় পাচ্ছেন অনেকে।
রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজ মণ্ডল বলেন, তাঁর ইউনিয়নের ১৬টি গ্রামের চারপাশে এখন পানি। সড়কগুলো ডুবে যাওয়ায় স্বাভাবিক চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক বাড়ির ভেতরে পানি না ঢুকলেও বসতভিটা পর্যন্ত পানি উঠে এসেছে। এতে প্রায় ৩০ হাজারের বেশি মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। পানির দুর্ভোগের পাশাপাশি সাপের আতঙ্কেও দিশেহারা হয়ে পড়েছেন মানুষ।
এদিকে পদ্মার পানি বৃদ্ধিতে ফিলিপনগর ও মরিচা ইউনিয়নের চরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ আবাদি জমিও তলিয়ে গেছে। উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার পর্যন্ত চিলমারী, রামকৃষ্ণপুর, ফিলিপনগর ও মরিচা ইউনিয়নে মোট ৩৫১ হেক্টর আবাদি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন মরিচ ও কলাচাষিরা।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রেহেনা পারভীন বলেন, ‘পদ্মার চরজুড়ে চারটি ইউনিয়নে ৩৫১হেক্টর আবাদি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ আরও বাড়বে। এতে মরিচ ও কলাচাষিরা বেশি ক্ষতির মুখে পড়বেন।’
পানি ওঠায় বিদ্যালয়গুলোর পাঠদানও বন্ধ রয়েছে। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোস্তাক আহমেদ ও মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের একাডেমিক সুপারভাইজার কামাল হোসেন জানান, বিদ্যালয়গুলোর চারপাশে পানি উঠে যাওয়ায় শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভেতরেও পানি প্রবেশ করেছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিন্দ্য গুহ ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ের কর্মকর্তারা বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে প্লাবিত এলাকা পরিদর্শন করেন। এ সময় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে জরুরি সহায়তা হিসেবে শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা শুভাগত বিশ্বাস বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যে প্লাবিত এলাকা পরিদর্শন করেছি। বানভাসি মানুষের তালিকা তৈরি করে তাঁদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। পরিস্থিতির অবনতি হলে দুর্গতদের আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি আমরা নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রেখেছি।’
দুর্গত এলাকার বাসিন্দারা জানান, জীবন রক্ষায় অবিলম্বে পর্যাপ্ত শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বানের পানিতে বিষধর সাপের উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় সাপের কামড়ের চিকিৎসায় পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম মজুত রাখা এবং ভ্রাম্যমাণ মেডিকেল টিম গঠনের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে চরাঞ্চলে মানবিক সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
এ বিষয়ে দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা চিকিৎসক তৌহিদুল হাসান তুহিন বলেন, ‘হাসপাতালে পর্যাপ্ত পরিমাণ অ্যান্টিভেনম মজুত রয়েছে। সাপে কাটলে কোনো ধরনের দেরি না করে আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে আসতে হবে। সময়মতো চিকিৎসা নেওয়া গেলে সাপে কাটার ঝুঁকি অনেকটাই মোকাবিলা করা সম্ভব।’